টেকসই গার্মেন্টসের জন্য শ্রমিকের জীবনমানে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ

দেশের গার্মেন্টস টেকসই খাত হিসেবে গড়ে তুলতে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নসহ শ্রম অধিকারে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিদেশি ক্রেতা ও ব্র্যান্ডের প্রতিনিধিসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। তারা বলছেন, এটি কেবল শ্রমিক কিংবা তাদের পরিবারের স্বার্থে নয়, এর সুফল পাবে গার্মেন্টস খাতসহ গোটা দেশ। একই সঙ্গে গার্মেন্টস খাতের সরবরাহ চেইনকে টেকসই করতে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কার্যকর সামাজিক সংলাপের আহ্বানও জানিয়েছেন তারা। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) আয়োজিত সাসটেইনেবল অ্যাপারেল ফোরামের (এসএএফ) দিনব্যাপী আলোচনায় এসব বিষয়ে কথা বলেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ (বিএই) ও পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ যৌথভাবে ঐ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অবশ্য পোশাক খাতের সরবরাহ চেইনকে টেকসই করতে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি ক্রেতা ও ব্র্যান্ড এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। এ সময় জলবায়ু পরিবর্তন পোশাক খাতের সরবরাহ চেইনে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—তাও আলোচনায় উঠে এসেছে।

এসএএফের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ছাড়াও স্থানীয় উদ্যোক্তা ও ব্র্যান্ডের প্রতিনিধি ও কূটনীতিকরা এ খাতকে টেকসই করার ক্ষেত্রে তাদের মতামত তুলে ধরেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকায় কানাডার হাইকমিশনার বেনয়ে প্রেফন্টেইন বলেন, সাপ্লাই চেইন ইস্যুতে আমাদের অনেক প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। শ্রম ইস্যু, কারখানা পরিদর্শন ব্যবস্থাসহ সার্বিক স্বচ্ছতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কানাডার ক্রেতারা এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। কর্মপরিবেশ ইস্যুটি কেবল শ্রমিক বা তাদের পরিবারের জন্য নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

সুইডেনভিত্তিক ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএমের সাসটেইনেবিলিটির প্রধান পিয়েরে বারজেসন বলেন, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ উন্নয়নে শক্তিশালী সামাজিক সংলাপ প্রয়োজন। বিজিএমইএ এক্ষেত্রে উদ্যোগ নিতে পারে। বিশেষত শ্রমিকের মজুরি বাড়ানো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও  লিঙ্গভিত্তিক সমতার বিষয়টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের সংলাপ ভালো ফল দিতে পারে। এ সময় জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত ইস্যুটি কীভাবে সরবরাহ চেইনে প্রভাব ফেলতে পারে—সে বিষয়েও আলোকপাত করেন তিনি।

আতিকুল ইসলাম বলেন, টেকসই করার ক্ষেত্রে ক্রেতাদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। এ খাতকে টেকসই ও কমপ্লায়েন্ট করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমও। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিজিএমইএর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল। এ সময় আয়োজক প্রতিষ্ঠানের প্রধান মোস্তাফিজ উদ্দিনসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

দিনব্যাপী বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নিয়ে রপ্তানিকারকদের প্রতিনিধিরা বলেন, সরবরাহ চেইনকে টেকসই করার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলা হলেও যে দায়িত্ব নেওয়ার দরকার—তা আলোচনায় সঠিকভাবে আসে না। মুনাফার সিংহভাগ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিগুলো নিয়ে যাচ্ছে। উত্পাদনকারী কী পাচ্ছে তা বিবেচনায় আসে না। বিশ্বের শীর্ষ ধনীরা ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির মালিক।  বিজিএমইএর পরিচালক আবদুল মোমেন বলেন, পুরো সরবরাহ চেইনে এক ধরনের ‘অবিশ্বাস’ কাজ করছে। আপনাকে পণ্যের দর নিয়েও কথা বলতে হবে। অথচ দুঃখজনকভাবে এ বিষয়ে তেমন কথা হয় না।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, আমাদের অনেক ভালো বিষয় থাকলেও তা আলোচনায় আসে না। তিনি বলেন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া কিংবা মিয়ানমারের চাইতেও এখানে সামাজিক সংলাপের বিষয়টি অনেক ইতিবাচক। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে তিনি আঙুল তোলেন বিদেশি ক্রেতাদের দিকেও। তিনি বলেন, আমরা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করলাম, আর দেখা গেল পরদিন ব্র্যান্ড ঐ কারখানা থেকে ব্যবসা সরিয়ে নিল। এটি সাসটেইনেবিলিটি নয়।

একই দিন অনুষ্ঠানের পাশের ভেন্যুতে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ডেনিম পণ্যের প্রদর্শনী। বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপো নামে এবারের প্রদর্শনীতে বিশ্বের ১১টি দেশের প্রায় ১০০ প্রতিষ্ঠান তাদের ডেনিম ফেব্রিকের প্রদর্শনী করছে। প্রদর্শনী শেষ হচ্ছে আজ।