টঙ্গীর ক্রাইম জোন হিসেবে এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত এরশাদনগর (বাস্তুহারা) বস্তি। এটি সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী, খুনি, ছিনতাইকারী, ডাকাত, পকেটমার, অপহরণকারী আর মাদকসেবীদের নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৪৯ ও ৫০ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই বিশাল বস্তিতে হাত বাড়ালেই সহজে পাওয়া যায় মাদক। সেখানে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার মাদক বেচাকেনা হয়ে থাকে। ঢাকা ও তার আশপাশ এলাকাগুলো থেকে কিলার গ্রুপের সদস্য, দাগি সন্ত্রাসী, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ীরা এই বস্তিতে রাত্রিযাপন করে থাকে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। মাদক ব্যবসার পেছনে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতা জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রায় প্রতিদিনই এই বস্তিতে মাদকসহ ঘর দখলকে কেন্দ্র করে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটছে। টঙ্গী থানায় প্রতি মাসে অনেক অভিযোগ জমা পড়ে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, রাজধানীসহ সারাদেশ থেকে আসা অপরাধীরা এরশাদনগর বস্তিকে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বেছে নিয়েছে। পুলিশ ও র্যাবের অভিযান থেকে বাঁচতে তারা মাদক সেবন করে বস্তির ঝুপড়িঘরে রাত্রিযাপন করে। এই বস্তিতে শত শত অলিগলি ও সরু রাস্তা রয়েছে। রয়েছে উঁচু-নিচু ঘরবাড়ি। বস্তিতে ঢুকলেই গা শিউরে ওঠে। আশপাশের লোকজন মাদকপল্লি হিসেবে এটাকে চেনে। টঙ্গীর ১৮টি বস্তির মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়ো এবং জনসংখ্যা ১ লাখ।
এরশাদনগর বস্তিবাসীর সঙ্গে কথা বলে মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও প্রভাবশালী মহলের কতিপয় ব্যক্তি এবং তাদের সহযোগীদের সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। সোলাইমান নামের এক মাদকসেবী বলেন, ‘টাকা দিয়ে মাদক কিনে খাই, আমরা কাউকে কেয়ার করি না। পুলিশ তো আমাদেরই মামু। তাদেরকে নিয়মিত হারে মাসোহারা দেই।’
সূত্র জানায়, এরশাদনগরে পুলিশ ও ডিবি পুলিশের নামধারী সোর্সদের উত্পাত রয়েছে। টাকা না দিলেই উক্ত সোর্সরা মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঝামেলা করে। সন্ত্রাসের জনপদ এই বস্তিতে কমপক্ষে শতাধিক স্পটে মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইন, নেশার ইনজেকশন প্রকাশ্যে অনেক তরুণ-তরুণীকে নিতে দেখা গেছে। এখানে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী এসে মাদক সেবন করে। রাত যত বাড়তে থাকে, বস্তিতে নেশাখোরদের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে। সারা রাত চলে জুয়া ও মদের আসর। বস্তিতে ভাসমান পতিতার সংখ্যা দুই শতাধিক। তারা নেশাগ্রস্ত হয়ে খদ্দেরের অপেক্ষায় থাকে। একশ্রেণির মাদকসেবী ও রিকশাচালক এদের মূল খদ্দের। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ঐ বস্তিতে যারা মাদক ব্যবসা করে এদের সংখ্যা শতাধিক। আর এদের সহযোগী রয়েছে তিন শতাধিক।
সূত্র জানায়, এরশাদনগর বস্তিতে অনেক দাগি সন্ত্রাসী রাত-দিন আসা-যাওয়া করে। এদের মধ্যে অনেকের নামে অসংখ্য মামলাও রয়েছে। এছাড়া গভীর রাতে পেশাদার কিলার গ্রুপের সদস্যরা মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল খেয়ে রাস্তায় গিয়ে চাপাতি, ছোড়া ও অস্ত্র নিয়ে ছিনতাই করে।
র্যাব ও পুলিশ এরশাদ নগর এলাকা থেকে অস্ত্র, গুলি, ছোরা, চাপাতিসহ বহু সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজকে ধরে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। এদের মধ্যে অনেক সন্ত্রাসী জেল থেকে জামিনে বের হয়ে পূর্বের পেশায় ফিরে আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
টঙ্গী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. কামাল হোসেন জানান, এরশাদনগর বস্তি থেকে সহজে কোনো আসামিকে গ্রেফতার করা যায় না। আর এই বস্তিতে প্রতিদিন হামলা, মারামারির ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে আমরা অনেক সময় বেকায়দায় পড়ে যাই। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠিত হওয়ার পর আমরা এরশাদনগর বস্তি থেকে তালিকাভুক্ত একাধিক অপরাধীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি।