সামিনা লুত্ফা নিত্রা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। মনে প্রাণে থিয়েটার করেন অনেক বছর। শুরুটা করেছেন সুবচন নাট্য দলের সঙ্গে। ২০১০ সালে কয়েকজন তরুণ নাট্যকর্মীর সঙ্গে মিলে গড়ে তুলেছিলেন বটতলা নামের নাটকের দল। ‘খনা’, ‘ক্রাচের কর্নেল’, ‘ট্রায়াল অব মাল্লাম ইলিয়া’সহ বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করে স্বাক্ষর রেখেছেন দক্ষতার। অভিনয় ও বটতলার উত্সব নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন মাহবুব আলম
মঞ্চে অভিনয়ের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কি না? যদি হয় তাহলে কিভাবে?
মঞ্চে যারা কাজ করেন, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যদি থাকে, এটাতে তো কোনো অসুবিধা নেই, বরং অনেক কিছুতে সুবিধা হয়। কিন্তু মঞ্চে যারা কাজ করেন, তাদের বেশির ভাগেরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে থিয়েটারে কাজ করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যে অবশ্যই থাকতে হবে, এটা আমার মনে হয় না, কারণ এখানে যারা নাটক চর্চা করছেন, তাদের বেশির ভাগেরই, মানে প্রায় ৯৫ ভাগ থিয়েটার কর্মীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকলে অবশ্যই ভালো হতো।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে কোনো দিক নির্দেশকের সহায়তা অভিনেতার জন্য জরুরি বলে মনে করেন কি?
প্রথমত যদি অরগানিক্যালি বলা হয়, তাহলে নির্দেশক তো পুরো বিষয়টাকেই দেখবেন, কেননা নির্দেশকই তো আসলে পুরোটা জানেন। কিন্তু চরিত্রটার যে বিভিন্ন দিক, যে ডাইমেনশন, যে মাত্রা আছে, (সেটা প্রতিটি দৃশ্যে এবং দৃশ্যের ভেতরেও) যদি অভিনেতা নিজে বুঝতে না পারে তাহলে শুরুর দিকে এগুলো নিয়ে নির্দেশকের সঙ্গে কথা বলতে হবে। কারণ নির্দেশকের ভাবনাটা অবশ্যই তার অভিনেতাকে জানাতে হবে। তবে আমি মত দিই অভিনেতার নিজের কর্ম প্রবণতার পক্ষে। আমি মনে করি, অভিনেতাকে আসলে অনেক দূর পৌঁছাতে হয়; নির্দেশকের প্রত্যাশার থেকেও বেশি দূরে। সেটার জন্য অভিনেতার নিজেরও অনেক বেশি প্রস্তুতির দরকার হয়। এই প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দেশক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবেন না, বরং সহযোগিতা করবেন।
সামগ্রিক বিবেচনায় গ্রুপ থিয়েটার চর্চা থিয়েটারকে কতটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন?
আমরা যদি বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটার চর্চার দিকে ফিরে তাকাই তাহলে দেখি, এটা আন্দোলন হিসাবেই শুরু হয়েছিল। সেদিক থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর গ্রুপ থিয়েটার চর্চার আন্দোলন শুরু হয়েছিল প্রথমত দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। একটি হলো অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন বাতিল করা, আর আরেকটি আমাদের নিজস্ব মিলনায়তন নির্মাণ। এখন কিন্তু দুটো দাবিই পূরণ হয়ে গেছে। আন্দোলন সব সময়ই কোনো দাবি আদায়ের জন্য হয় এবং সেই দাবি পূরণ হয়ে গেলে সেই আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে, এটাই খুব স্বাভাবিক। এই আন্দোলন করে অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন বাতিল এবং মঞ্চ পাওয়ার পর গ্রুপ থিয়েটার অরগানাইজড হয়েছে বলে আমার মনে হয়। বর্তমানের বাস্তবতা হলো বড় দল নিয়ে কাজ করা একটু কঠিন, আর সে কারণেই ত্রিশজনের একটা দল নিয়ে নাটক করে সেটাকে চালিয়ে নেওয়া কঠিন। আবার চার-পাঁচজনকে নিয়ে নাটক করলে গ্রুপ থিয়েটারে আইডোলজিক্যাল বার্ডেন বহন করতে হয়, সেটা রেপার্টরিতে গেলে বহন করতে হয় না। বিভিন্ন দলের ছেলেমেয়েরা আসে, তাদের সঙ্গে নির্দিষ্ট একটি চুক্তিতে কাজ হয়। আজ থেকে দশ পনের বছর পর যদি এটাই সবাই করতে থাকে, তাহলে এটাই হয়তো মূল ধারা হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে। তবে গ্রুপ থিয়েটার যদি সেখান থেকে ব্যাক করতে পারে এভাবে যে ত্রিশ জনের নাটক করার সুযোগ তারা দেবে। ত্রিশজন ছেলেমেয়ে নিয়ে কাজ করার জন্য যে রিসোর্স, তা সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান বহন করবে, তাহলে গ্রুপ থিয়েটার টিকে যাবে।
অনেকেই মনে করেন উত্সব মানেই মানহীন নাটকের বিনিময়। এই ভাবনাকে কিভাবে বিবেচনা করবেন?
খুব যে ভুল কথা বলছে, তাও তো নয়। গত কয়েকদিনে হয়ে যাওয়া উত্সবদুটো দেখার সুযোগ হয়নি আমার। একটা উত্সবে আমরা বটতলা পারফর্ম করলাম। হয়তো ইচ্ছা আছে কিন্তু লোকবল নেই বা টাকাপয়সা নেই, সেটা হতে পারে। সেক্ষেত্রে নিজেদের লোকবল এবং টাকাপয়সা অনুযায়ী প্ল্যান করাই ভালো। তবে আমরা যে উত্সব করি, সেটা দুই বছর পর পর করি। এবার তিন বছর পরে করছি। আমরা এই বিনিময়টা অ্যাভয়েড করারই চেষ্টা করি। আমরা নাটকের মান বিবেচনা করেই নাটক আনার চেষ্টা করি। বিনিময়ে আমরা আসলে যাই না। যে কারণেই হয়তো বটতলা মানসম্পন্ন নাটক তাদের উত্সবে নিয়ে আসতে পারে। আমরা আমাদের রিসোর্সের ভিত্তিতে ভালো মানের নাটক নিয়ে আসার চেষ্টা করি। এবারও আমরা ইরানের দলটাকে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি, শুধু তাদের মানের কারণে। এটা নয় যে তারা আমাদের দলকে নিয়ে যাবে। তাছাড়া নাটক দেখলেই মানুষ বুঝে যায় যে কোনটা বিনিময়।
নাট্য সংশ্লিষ্ট নয়, এমন একটি ভেন্যুতে নাট্যোত্সব করার পরিকল্পনা কেন?
নাট্য সংশ্লিষ্ট নয়, এটা তো একেবারে ঠিক নয়, কারণ হলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর যখন সেগুনবাগিচাতে ছিল, তখন আমরা নিজেরাই ওখানে অনেকবার শো করেছি, যদিও ওটা তখন নাটক করার জন্য তেমন ভালো জায়গা ছিল না। আসলে আমাদের এই শহরে নাটক করার জায়গা নেই। এই জায়গাটা যতটা বাড়ানো যায়, সে চেষ্টা বটতলা প্রথম থেকেই করে এসেছে। সবকিছু মিলিয়ে বটতলা একেবারে শুরু থেকেই নতুন ভেন্যু খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। আর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আমাদের সবার এত প্রিয় জায়গা, এত সুন্দর করে বানানো হয়েছে যে সেটা কালচারাল সেন্টার বা হাব হিসেবে ব্যবহার হওয়া উচিত।
ছবি তন্ময় মির্জা