ইত্তেফাক রিপোর্ট
দেশের শ্রমশক্তির ৮৭ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়োজিত রয়েছে। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করতে কর্মসংস্থানের কাঠামো আরো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাজাতে হবে। সেই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করতে হবে। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। সাধারণ মানুষকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে হবে। এবারের বাজেটে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর রূপরেখা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এজন্য আর্থিক খাতের সংস্কারসহ বর্তমান পেনশন ব্যবস্থা নতুন করে সাজাতে হবে। পেনশনের অর্থ বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক, পুঁজিবাজার বা অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে। গতকাল বুধবার গুলশানে একটি মিলনায়তনে বাংলাদেশে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা নিয়ে আয়োজিত সংলাপে বক্তারা এ কথা বলেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডয়ালগ (সিপিডি) এবং অক্সফাম যৌথভাবে এই সংলাপের আয়োজন করে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় আয়োজিত সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ। আলোচনায় অংশ নেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। এছাড়া অক্সফামের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. দিপঙ্কর দত্ত স্বাগত বক্তব্য দেন। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার কাঠামো নিয়ে গবেষণা নিবন্ধ তুলে ধরেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে ৬৫ ঊর্ধ্ব জনসংখ্যা ৭৯ লাখ। সরকারি পেনশনের আওতায় এসেছে মাত্র ৭ দশমিক ৬ শতাংশ । এর বাইরে বয়স্ক ভাতার আওতায় রয়েছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। বেসরকারিভাবে পেনশনের আওতায় রয়েছে আরো ১০ শতাংশ মানুষ। সবমিলিয়ে ৬৫ বছরের ওপরে ৬০ শতাংশ মানুষ সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আসলেও এখনো ৪০ শতাংশ মানুষের বাইরে রয়ে গেছে। বয়স্কদের অর্ধেক এখনো ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করতে ২০৩০ সাল নাগাদ জিডিপির শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে হবে। এর প্রাথমিক পর্যায় শুরু করতে হলেও জিডিপির হিসেবে বাড়তি ২ থেকে ৩ শতাংশ রাজস্ব বাড়াতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, এতদিন আমরা দরিদ্র মানুষের জন্য ভাত-কাপড়ের সংস্থান করার কথা বলতাম। কিন্তু এখন আমরা সর্বজনীন পেনশনের মতো বিষয় নিয়ে কথা বলছি। এটা অগ্রগতিকেই প্রকাশ করে। আওয়ামী লীগ সরকার বিগত ১০ বছরে যে উন্নতি করেছে এটা তারই প্রতিফলন। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম ভাতা কর্মসূচি চালু করে যা। পরে ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী চান আরো বাড়িয়ে এই ভাতা দিতে। কিন্তু তিনি মাঝে মাঝে একটা শঙ্কা প্রকাশ করেন, যাতে এই ভাতার ওপর কেউ পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে আয় রোজগার বন্ধ না করে দেন।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, সর্বজনীন পেনশন প্রবর্তনের জন্য শুধু অর্থায়ন করলেই হবে না, নীতি কাঠামোর পরিবর্তন করতে হবে। আর্থিক কাঠামোকে সেভাবে সাজাতে হবে। সেই সঙ্গে সামাজিকভাবে বিভিন্ন পক্ষের চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশ প্রগতিশীল মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত হতে যাচ্ছে। সেজন্য দেশের এক-চতুর্থাংশ দরিদ্র মানুষকে পেছনে ফেলে এগুনো যাবে না। দেশের অর্ধেক মানুষ যারা সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের বাইরে আছে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করতে হলে বর্তমান পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। যে দরিদ্র মানুষের কথা বলা হচ্ছে—তাদের প্রিমিয়াম দেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না সেটি দেখতে হবে। তাছাড়া এই অর্থ যে খাতে বিনিয়োগ করা হবে সেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতাও দেখতে হবে।