পেঁয়াজের বর্তমান বাজারমূল্য সকল পর্যায়ের সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলেছে। হঠাত্ করেই নিত্যপণ্য পেঁয়াজের এমন ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি সরকারকেও ভাবিয়ে তুলেছে। দেখা যায় উত্পাদন মৌসুমে কম মূল্যের কারণে যেসব পণ্য কৃষকরা রাস্তায় ফেলে দেয়। আর সেই পণ্যই আবার কিছুদিনের মধ্যেই অধিকমূল্যের কারণে বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না। উত্পাদন মৌসুমে এবারও কেজিপ্রতি পেঁয়াজের মূল্য ছিল ১০-১২ টাকা মাত্র। অথচ গত দুই-তিন মাসে, অর্থাত্ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-নভেম্বর ২০১৯ সময়ে সেই পেঁয়াজের মূল্য বেড়ে এখন ১৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো কখনো কোনো কোনো পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাজারে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। দেখা যায়, কিছুদিন এগুলো আলোচনায় থাকে। হয়তো আমদানিকারকদের উদাসিনতা অথবা ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে এসব সংকট সৃষ্টি হয়ে থাকে বলে ধারণা করা হয়। সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য কিংবা পরামর্শ না থাকার কারণে সরকারি আমদানি পরিকল্পনা গ্রহণেও বিলম্ব হতে পারে। তবে যেহেতু বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ এবং পেঁয়াজ উত্পাদনের জন্য যথেষ্ট অনুকূল পরিবেশ আমাদের রয়েছে। কাজেই এখানে কেন আরো অধিক পরিমাণে পেঁয়াজ উত্পাদন করা হবে না, তা নিয়েই ভাবতে হবে এখন।
সরকার যেসব তথ্য কিংবা পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে বাত্সরিক ক্রয় বা আমদানি পরিকল্পনা গ্রহণ করবে সেসব সংস্থার সরবরাহকৃত তথ্যের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক গড়মিল। যার কারণেও হয়তো পরিকল্পনা প্রণয়নে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত কয়েকটি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এমন চিত্রই ফুটে ওঠে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, পেঁয়াজনামক গুরুত্বপূর্ণ পণ্যটির জন্য ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২,১২,১৯৪ হেক্টর এবং মোট উত্পাদন ছিল ২.৩৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন, তার পরের বছর অর্থাত্ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২,১৬,০০০ হেক্টর এবং মোট উত্পাদন ছিল ২.৩৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পেঁয়াজের উত্পাদন বেড়েছে ৫৯% ইত্যাদি ইত্যাদি।
আবার বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস (বিবিএস) এর তথ্য মতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১.৮৬ মিলিয়ন টন উত্পাদন হয় যার বিপরীতে চাহিদা হলো ২.৪ মিলিয়ন টন। আরেকটি রিপোর্টে দেখা গেছে ২৪ লক্ষ মেট্রিক টন চাহিদার বিপরীতে প্রতিবছর আমদানি করতে হয় কমপক্ষে ১১ লক্ষ মেট্রিক টন। তবে এটি ঠিক যে উত্পাদনের মাত্রা নির্ভর করে প্রতিবছর চাহিদা এবং আমদানি ভিন্নরকম হতে পারে। সেজন্যই প্রয়োজন সঠিক পরিসংখ্যান। তাছাড়া পেঁয়াজ একটি পচনশীল পণ্য বিধায় তা আমদানি করে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের সুযোগ নেই। সেজন্য আমদানি পরিকল্পনা হতে হবে নির্ভুল।
অর্থাত্ আমরা যে পরিসংখ্যানই বিবেচনা করি না কেন মোটকথা আমাদের চাহিদার সঙ্গে উত্পাদনের ব্যাপক ফারাক রয়েছে। সেই ফারাক পূরণ করার জন্যই প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। অথচ পেঁয়াজ উত্পাদনের জন্য সবধরনের সুযোগ-সুবিধা বাংলাদেশের কৃষিতে বিদ্যমান। আমাদের বাঙালিদের একটি সংকট হলো যখন যেদিকে যেতে থাকি তখন সবাই সেদিকেই যেতে থাকি। পিছনে ফিরেও দেখি না কিংবা অতশত ভেবেচিন্তে কাজ করি না। সেজন্য আমাদেরকে হুজুগের জাতি বলা হয়। একসময় আমাদের দেশেই পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মরিচ ইত্যাদি ফসল আরো বেশি চাষ করা হতো। কিন্তু সেচের সুবিধা পাওয়ায়, উচ্চফলনশীল জাত আবিষ্কৃত হওয়ায় এবং উত্পাদন পদ্ধতি সহজ হওয়ায় ও অধিক লাভের আশায় কৃষক এখন ধানের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে। সেজন্য দেখা গেছে সকল কৃষক উঁচু-নিচু সবধরনের জমিতেই এখন ধান আবাদ করছে। তাতে কমে যাচ্ছে উপরোক্ত ফসলের জমির পরিমাণ। আর ধানের উত্পাদন বাড়াতে বাড়াতে আমরা এমন পর্যায়ে চলে এসেছি এখন কৃষক আর ধানের মূল্য পাচ্ছেন না। এমনকি সরকারি গুদামে পর্যন্ত জায়গা সংকুলান হচ্ছে না। বিগত কয়েক বছর যাবত্ গোলআলুর উত্পাদন নিয়েও কৃষকের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আমরা জানি যেসব জমিতে আলু উত্পাদিত হয় সেসব জমিতেই পেঁয়াজ উত্পাদন করা সম্ভব। কাজেই এখন পেঁয়াজের উত্পাদন বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনে ধান এবং আলুর জমি কমিয়ে দিতে হবে। আবার সেটি একবার শুরু করলে বারবার তাই করতে হবে এমনটি নয়। তাহলে আবার সমস্যা সৃষ্টি হবে। সেজন্য প্রয়োজন প্রতিবছর সংশ্লিষ্টদের সঠিক সময়ে সঠিক পরিসংখ্যান ও তথ্য দিয়ে সরকারকে পরিকল্পনা গ্রহণে সহযোগিতা করা। কাজেই এভাবেই পেঁয়াজের উত্পাদন বাড়িয়ে আমাদের এ সঙ্কট মোকাবিলা করলে তা হবে স্থায়ী সমাধান। অন্যথায় পেঁয়াজ আমদানির কোনো একটি বা দুইটি দেশের ওপরও আমাদের নির্ভর করার প্রয়োজন হবে না। তখন ব্যবসায়ীরাও সিন্ডিকেট সৃষ্টি করে জনদুর্ভোগ তৈরি করতে পারবে না।
n লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়