কষ্টে পিপলস লিজিংয়ের আমানতকারীরা

বিনিয়োগকৃত অর্থের লাভ দিয়ে কারো সংসার চলত। আবার কারো চিকিত্সার অর্থ আসত। কেউ কেউ ক্যানসার রোগীর কেমোর খরচও জোগাতেন এমন বিনিয়োগের লাভ থেকেই। তবে গত জুন মাসে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড অবসায়ন হয়ে যাওয়ায় অনেকেরই আয়ের উত্স বন্ধ হয়ে গেছে। এ প্রতিষ্ঠানে আমানত রেখে দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন অনেকে।

এমন বিপদগ্রস্ত আমানতকারীরা আগামী মাসের ৩১ তারিখের মধ্যে টাকা ফেরত চান। এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতা চেয়েছেন তারা। গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি কনভেনশন হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পিপলস লিজিংয়ে ব্যক্তি পর্যায়ের আমানতকারীরা এ দাবি করেন। এ প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬ হাজার ব্যক্তি পর্যায়ের বিনিয়োগকারী ছিলেন। তাদের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। অনুষ্ঠানে আমানতকারীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনটি দাবি তুলে ধরেন।

দাবিগুলো হলো—চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে হবে। পিপলস লিজিংকে অবসায়ন করার সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে এসে তা পুনর্গঠন করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া অবিলম্বে পিপলস লিজিংয়ের সঙ্গে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে। বিশেষ করে দোষী ব্যক্তিরা যেন বিদেশ পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য তাদের বিদেশ যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে এবং তাদের সম্পত্তি ও ব্যাংক হিসাব জব্দ করতে হবে।

এর আগে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে একই বিষয়ে দেখা করেছেন বিনিয়োগকারীরা। ‘পিপলস লিজিং এন্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিতে আমানকারীগণের কাউন্সিল’ নামে একটি ১২ সদস্যের কাউন্সিলর রয়েছে আমানতকারীদের। ওই কাউন্সিলের আহ্বায়ক মো. আনোয়ারুল হক, যুগ্ম আহ্ববায়ক কামাল আহমেদ ও রানা ঘোষ, সম্পাদক প্রশান্ত কুমার দাস অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। এছাড়া বক্তব্য দেন প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিক, সদস্য সামিয়া বিনতে মাহবুব। অনুষ্ঠানে ২০০’র বেশি আমানতকারী উপস্থিত ছিলেন।

দুটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে মোরশেদা ইসলামের। স্বামী নেই। একমাত্র সন্তানও অসুস্থ। উদ্যোক্তা এ নারী তার সর্বস্ব রেখেছিলেন পিপলস লিজিংয়ে। এখন এ প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। ফলে টাকার অভাবে কিডনিও পরিবর্তন করতে পারছেন না। অন্যদিকে সংসার চালানোও কষ্টসাধ্য হয়ে গেছে।

একজন বাংলাদেশি জাপানি মেহরিন হাসানের বাবা যিনি টাকা ফেরত না পেয়ে পিপলস লিজিংয়ের অফিসে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তিনি বলেন, টাকা ফেরত না পেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্যে দিন যাচ্ছে। একইভাবে নিজেদের কষ্টার্জিত টাকা পিপলস লিজিংয়ে রেখে দুর্গতির কথা তুলে ধরেন, শিল্পী মোস্তফা জামান আব্বাসী, এনামুল হক নির্ঝর, মোহসিনা হাসান, আযরা নবীন আহমেদ, আসমা হক, মাহমুদুল হাসান প্রমুখ।

সামিয়া বিনতে মাহবুব নামের একজন আমানতকারী বলেন, আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে লাইসেন্স নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানে টাকা রেখেছি। এমনকি আমানতের বিপরীতে উপযুক্ত ট্যাক্স দিয়ে আসছে সবাই। তাহলে আমাদের আমানতের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব কার—এ বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। প্রসঙ্গত, নানা অনিয়ম, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনায় চরম সংকটে পড়ে আর্থিক সংকটে পড়ে ব্যাংকবহির্ভূত এ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সাল থেকে ক্রমাগত লোকসান গুনছিল। ফলে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছিল না প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৭ জুন অবসায়ন করার অনুমোদন দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। এটাই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের উদ্যোগ। ১৯৯৭ সালের ২৪ নভেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিপলস লিজিংকে অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে নানা অনিয়মে এ প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা, এর মধ্যে খেলাপিই ৭৪৮ কোটি টাকা। অর্থাত্ মোট ঋণের ৬৬ শতাংশই খেলাপি।