‘একটি লক্ষ্য ঠিক করো। সেই লক্ষ্যকে নিজের জীবনের অংশ বানিয়ে ফেলো। চিন্তা করো, স্বপ্ন দেখো। তোমার মস্তিষ্ক, পেশি, রক্তনালি, সারা শরীরে লক্ষ্যকে ছড়িয়ে দাও, আর বাকি সব কিছু ভুলে যাও। এটাই সাফল্যের পথ।’ স্বামী বিবেকানন্দের এই মহান উক্তিটি বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয়ই প্রাধান্য পায়, তা হলো স্বপ্ন দেখো। স্বপ্নকেই লক্ষ্য স্থির করো, স্বপ্নের পেছনেই লেগে থাকো। স্বপ্ন বাস্তবায়নকে ধ্যান-জ্ঞান ভাবতে থাকো।
স্বপ্ন হলো জীবনের জ্বালানিস্বরূপ। স্বপ্নই মানুষকে মহাকালের বুকে সহস্র বছর বাঁচিয়ে রাখে। যদি ১৮ শতকে রাইট ভ্রাতৃদ্বয় আকাশে ওড়ার স্বপ্ন না দেখত, তাহলে হয়তো আজও আমরা আকাশে উড়তে পারতাম না। যদি থমাস আলভা এডিসন অন্ধকার দূরের স্বপ্ন না দেখত, তাহলে হয়তো আমরা বৈদ্যুতিক আলোয় উদ্ভাসিত হতে পারতাম না। যদি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৭ কোটি মানুষের চোখে নিজের দেখা স্বপ্নের বীজ বুনে না দিত, তাহলে হয়তো আমরা আজও পরাধীনতার শিকল ভাঙতে পারতাম না।
যুগে যুগে যত সভ্যতার উত্থান-উন্নয়ন, আজকে হাতের মুঠোয় পৃথিবীর পরিভ্রমণ সবকিছুই কোনো না কোনো স্বপ্নদ্রষ্টার স্বপ্নের ফসল। সূর্যকেন্দ্রিক পৃথিবীর ঘূর্ণায়নের তালে প্রতিটি মানুষই স্বপ্নের পিছু ছুটছে, সৃষ্টিশীলতার নেশায় দৌড়াচ্ছে। তাই সমাজ, রাষ্ট্র তথা বিশ্ব পরিবর্তন করতে হলে অবশ্যই স্বপ্ন দেখতে হবে, স্বপ্নে বিভোর হতে হবে।
কিন্তু বর্তমান তরুণ প্রজন্ম যেন দিন দিন স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাচ্ছে। তারা পরিবর্তনকে ভয় পায়, প্রক্রিয়াশীল পরিবর্তনে গা এলাতেও ভয় পায়। লক্ষ্যহীন জীবনযাপনের ফলে তাদের ভবিষ্যত্ সম্পর্কে যেমন সুস্পষ্ট ধারণার অভাব তেমনি পেশাভিত্তিক কর্মসংস্থান নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। স্বপ্ন না দেখার দরুন, আস্তে আস্তে উচ্চ আত্মবিশ্বাসও ফিকে হয়ে যায়, ক্রমশ নিজেকে অযোগ্য মনে হয়। প্রতিটা কাজের শুরুতেই নেতিবাচক চিন্তাগুলো দানা বাঁধে, ঝুঁকি গ্রহণে ভয়ের জন্ম নেয়। জীবনের একপর্যায়ে স্বপ্নহীন জীবনকে টেনে নেওয়া অর্থহীন মনে হয়, নিজেকে গুটিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। চরম অবসাদ, হতাশা গ্রাস করে। আত্মবিশ্বাসহীনতার দরুন একটা সময় অনেকে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশ টিনএজার কোনো না কোনোভাবে ডিপ্রেশনে ভুগছে। আমাদের দেশেও এই হার নিতান্ত কম নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে শতকরা ৪.১ ভাগ মানুষ ডিপ্রেশনে ভুগছে। অর্থনৈতিক সংকট, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা, মূল্যবোধের অবক্ষয়—এ বিষয়গুলো দেশের তরুণ সমাজকে হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রায়শ তারা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের প্রতি বিরক্তিকর অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা দেশ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে। তরুণ প্রজন্মের এমন হতাশাচ্ছন্ন মনোভাবের অন্যতম কারণ জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যর্থতা, লক্ষ্য পূরণে আত্মবিশ্বাসহীনতা।
প্রতিটি মানুষের জীবনেই সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সীমাবদ্ধতা থাকবেই। নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিয়ে সাফল্যের পথে হেঁটে যাওয়ার নামই আত্মবিশ্বাস। ‘আমি পারব’— এই আত্মবিশ্বাসের বদৌলতে শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও হেলেন কিলার, স্টিফেন হকিং, ক্রিস্টি ব্রাউনের মতো অসংখ্য মানুষ নিজ কর্মক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। আর্থিক সীমাবদ্ধতাকে উতরে গিয়ে এ পি জে আবদুল কালাম ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন।
বাংলাদেশের সোনালি ভবিষ্যত্ নিয়ে তরুণ প্রজন্মকে ভাবতে হবে, স্বপ্ন দেখতে হবে। বাংলাদেশের এই উন্নয়ন মহাযজ্ঞকে ত্বরান্বিত করতে বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে, নিজেদের যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কারণ, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ভবিষ্যত্ সোনার বাংলা তরুণদের হাতেই নির্মিত হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সাইন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর