‘বুলবুল’ মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে :প্রধানমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার সাইক্লোন ‘বুলবুল’ মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। জনগণের সুরক্ষা দিতে সংশ্লিষ্টদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের পরপরই ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করার প্রস্তুতিও রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়টি যেন ব্যাপক ধ্বংসাত্মক না হয়ে ওঠে সে জন্য সবাইকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার আহ্বান জানান তিনি গতকাল শনিবার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ  জাতীয় শ্রমিক লীগের ১৩তম জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয়। কাউন্সিলরদের সর্বসম্মতিক্রমে জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন ফজলুল হক মন্টু, সাধারণ সম্পাদক হন কে এম আজম খসরু। সভাপতির দায়িত্ব পাওয়া ফজলুল হক মন্টু শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি হিসেবে একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়া কে এম আজম খসরু সদ্য বিদায়ি কমিটির প্রচার সম্পাদক ছিলেন। সংগঠনের কার্যকরী সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন আবুল কালাম আজাদ। তিনি ছিলেন সদ্য বিদায়ি কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি। কাউন্সিলে সভাপতি পদে সাত জন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ১৩ জনের নাম প্রস্তাব হয়েছিল। তাদের নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তবে ঐ বৈঠকে সমঝোতা না হওয়ায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এবং কার্যকরী সভাপতি ঠিক করা হয়। পরে নতুন নেতৃত্বের নাম ঘোষণা করেন ওবায়দুল কাদের।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনের নামে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলোতে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য দায়ীদের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, উসকানি দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভুল পথে নেওয়াকে কেউ মেনে নিতে পারে না। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উসকানি দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সবাইকে মনে রাখতে হবে উচ্চশিক্ষার এসব প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থে পরিচালিত হয়। উসকানি দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিপদগামী করে আবার মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা কখনো মেনে নেওয়া যায় না। আর তা যদি করতে হয় তাহলে নিজেদের অর্থ নিজেদের জোগান দিতে হবে। বিপথে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকা বন্ধ করে দেওয়া হবে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘নিজেদের বেতন নিজেরা দেবে এবং নিজেদের খরচ নিজেরাই চালাবে, সরকার সব টাকা বন্ধ করে দেবে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। সরকার কেন টাকা খরচ করবে। সেটাও তাদের চিন্তা করতে হবে, তারা কোনটা করবে।’ তার সরকারের লক্ষ্য দেশের মানুষের কল্যাণ এবং উন্নয়ন করা, যে লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলোতে স্বল্প ব্যয়ে উচ্চশিক্ষার যে সুযোগ সরকার দিচ্ছে তার বিস্তারিত তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন—পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কী আমরা তা বুঝি না। যারা পড়াশোনা নষ্ট করে সেখানে ধর্মঘট করে দিনের পর দিন কর্মঘণ্টা নষ্ট করবেন। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা ব্যাহত করবেন, তারাই সব বুঝবেন । আর আমরা বুঝব না, এটা তো হয় না।’ তিনি বলেন, ‘অর্থ সরকার দেবে। সবরকম উন্নয়ন প্রকল্প সরকার বাস্তবায়ন করবে। আর সেখানে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে না, এটাও হতে পারে না।’ এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কথায় বলে স্বাধীনতা ভালো কিন্তু তাহা বালকের জন্য নহে। এটাও মাথায় রাখতে হবে।’ দাবি মেনে নেওয়ার পরেও ক্ষেত্র বিশেষে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দেশের আইনে আছে কেউ যদি কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে এবং সেটা যদি প্রমাণিত না হয় অভিযোগকারির ঐ আইনে বিচার হয়, সাজা হয়। কাজেই যারা কথা বলছেন তারা আইনগুলো ভালোভাবে দেখে নেবেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম এবং পড়াশোনা করেই এতদূর এসেছি। এটাও ভুলে গেলে চলবে না।’

তিনি বলেন, ‘যে বাংলাদেশে ’৭৫ এর পরে প্রতি রাতে ক্যু হতো। যেখানে হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি চলতো সেই বাংলাদেশ বিগত প্রায় এক দশকে অনেক দূর এগিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আজকে যারা বড়ো বড়ো কথা বলেন তাদের কোনো দিন ঐ সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুনিনি বরং তাদের পদলেহন করতেই দেখেছি, এটা হলো বাস্তবতা।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির দ্রুত বিকাশের লক্ষ্যে দেশের সব শ্রেণির মানুষকে নিয়ে একটি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ ঐক্যের নাম বাকশাল, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক লীগ। বাকশাল ছিল ঐক্যের প্ল্যাটফরম। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্ধ শিল্প কারখানাগুলোর মালিক যারা পাকিস্তানি ছিলেন সেই কারখানাগুলো জাতীয়করণ করে পুনরায় চালু করেছিলেন। যতগুলো সাব ডিভিশন অর্থাত্ মহকুমা ছিল প্রত্যেকটা মহকুমা তিনি একটা জেলায় রূপান্তর করে সেখানে গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। যাতে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করে একবারে তৃণমূল মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া যায়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের পদক্ষেপের ফলে দেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশের শ্রমিক এবং মেহেনতি মানুষ এবং তাদের পরিবার-পরিজনের জন্য সুন্দর ভবিষ্যত্ নিশ্চিত করাই আমাদের কাজ।

এর আগে সম্মেলনস্থলে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ সময় উপস্থিত ছিলেন। ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীর পরিবেশনায় এ সময় জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়। পরে শিল্পী ফকির আলমগীরের নেতৃত্বে একই শিল্পী গোষ্ঠীর শিল্পীরা মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন। আলোচনা পর্বের শুরুতে শোক প্রস্তাব পাঠ করা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চারনেতা, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ ১৫ আগস্টের সকল শহিদ, মুক্তিযুদ্ধের সকল শহিদ, সকল আন্দোলনে শহিদদের স্মরণে সকলে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। সম্মেলনে সারা দেশের ৭৮টি জেলা কমিটির প্রায় ৮ হাজার কাউন্সিলর এবং ডেলিগেট অংশগ্রহণ করেন। একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি দেশ থেকে আমন্ত্রিত অতিথি এবং শ্রমিক নেতৃবৃন্দও সম্মেলনে যোগ দেন।

সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, শ্রম এবং কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান, আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কান্ট্রি ডিরেক্টর তুয়োমো পটিয়াইনেন, আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন এশিয়া প্যাসিফিকর (আইটিইউসি-এপি) সাধারণ সম্পাদক শোভা ইওশিদা এবং দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক ট্রেড ইউনিয়ন কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক লক্ষণ বাহাদুর বাসনেত প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। শ্রমিক লীগ সভাপতি শুক্কুর মাহমুদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। এ সময় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, আবদুল মতিন খসরু, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, এনামুল হক শামীম, দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আজম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।