ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের অযোধ্যার বিতর্কিত ধর্মীয় স্থানে (বাবরি মসজিদ যেখানে ছিল) রামমন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। অন্যদিকে মসজিদ বানানোর জন্য অযোধ্যাতেই বিকল্প হিসেবে দ্বিগুণ জমি বরাদ্দ দিতে বলা হয়েছে। রামমন্দির ও মসজিদ বানানোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে তিন মাসের মধ্যে একটি ট্রাস্ট গঠনেরও নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
গতকাল ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে এই রায় দেয়। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন, এস এ বোডবে, ওয়াই ভি চন্দ্রচূড়, অশোক ভূষণ ও এস আবদুল নাজির। রায়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও হিন্দু সংগঠন সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তবে অসন্তোষ প্রকাশ করে উত্তরপ্রদেশের সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড জানিয়েছে, তারা এই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারে।
ভারতের ধর্মীয়-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোই থেকে বহু দশক ধরে সবচেয়ে বিতর্কিত ও রক্তক্ষয়ী ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত হয়ে এসেছে এই বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমি বিরোধ। যে কারণে গতকাল রায় ঘোষণার আগে ভারতজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। অযোধ্যার বিতর্কিত ধর্মীয় স্থানটিতে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত ১২ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়। গত দুই সপ্তাহ ধরে অযোধ্যায় কারফিউ জারি রয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক ও রাজস্থানসহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে গতকাল স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ রাখা হয়। গতকাল শনিবার হওয়ার কারণে বেশির ভাগ সরকারি অফিসেও ছুটি ছিল। এছাড়া ভারতজুড়ে ব্যাপক ধরপাকড় হয়েছে। নজরদারি বাড়ানো হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিচারপতিদের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। প্রধান বিচারপতি জেড ক্যাটেগরির নিরাপত্তা পাচ্ছেন। শুক্রবার প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উত্তরপ্রদেশের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন। রায় ঘোষণার আগের রাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইট করে বলেন, অযোধ্যার রায় কারো জয় বা কারো পরাজয় সূচিত করবে না। দেশের সামনে এই মুহূর্তে সাম্প্র্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখাই অগ্রাধিকার।
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতে বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতেই উগ্র কট্টরপন্থি বিভিন্ন হিন্দু সংগঠনের সদস্যরা বাবরি মসজিদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। বাবরি মসজিদ ভাঙার পর ভারতের নানা প্রান্তে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল তাতে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয় বলে ধারণা করা হয়।
ভারতের ঐতিহাসিকরা মোটামুটি একমত যে, মুঘল আমলে বাবরের একজন সেনাপতি মীর বাঁকি ১৫২৮ সাল নাগাদ বাবরি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে ভারতের হিন্দু সমাজের একটা বড়ো অংশ বিশ্বাস করে, তাদের আরাধ্য দেবতা শ্রীরামচন্দ্রের জন্মস্থানের ওপরই ওই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল।
এ নিয়ে এক মামলার রায়ে ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ বাবরি মসজিদের জমি তিন ভাগে বণ্টনের আদেশ দেয়। আদালতের নির্দেশনায় মুসলিম ওয়াকফ বোর্ড, নির্মোহী আখড়া আর রামনালা পার্টিকে সেখানকার ২ দশমিক ৭৭ একর জমি সমানভাগে ভাগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। হিন্দু-মুসলিম দুই পক্ষই সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে আপিল করেছিল। এই বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যেই সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করে। রায়ে সর্বোচ্চ আদালত ওয়াকফ বোর্ডের আর্জি এবং নির্মোহী আখড়া উভয় পক্ষের দাবি খারিজ করে দেয়। একইসঙ্গে অযোধ্যার বাবরি মসজিদের ২ দশমিক ৭৭ একর জমির মালিকানা দেওয়া হয়েছে ‘রামলালা বিরাজমান’ বা হিন্দুদের ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের শিশুরূপের বিগ্রহকে, যার অর্থ সেখানে রামমন্দিরই তৈরি হবে।
রায়ে বিচারপতিরা ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের (আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া) একটি রিপোর্ট উল্লেখ করেন যাতে বলা হয়েছিল, বাবরি মসজিদের নিচে একটি স্থাপনা ছিল বলে প্রমাণ মিলেছে। আর স্থাপনাটি ইসলামিক কোনো কিছু নয়। রায় অনুযায়ী রামমন্দির নির্মাণে আগামী তিন মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারকে ট্রাস্ট গঠন করতে হবে। বিতর্কিত জমির বিকল্প হিসেবে পাঁচ একর জমি মুসলিমদের মসজিদ নির্মাণের জন্য দিতে হবে। জমির অবস্থান ঠিক করবে কেন্দ্র অথবা রাজ্য সরকার। অযোধ্যার একটি দীর্ঘস্থায়ী, ভালো জায়গায় সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে জমি দিতে হবে।
টানা ৪০ দিন ধরে শুনানি চলার পর রায় দেওয়ার সময় সর্বোচ্চ আদালত বলে, এই আদালতকে এমন একটি বিরোধ সমাধানের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল যার সূত্রপাত হয়েছিল বহু আগে, আর তখন থেকেই এই বিতর্কিত স্থানটি নিয়ে উত্তেজনা চলে আসছে।
মন্দিরের জন্য জমি দেওয়ার বিষয়ে রায়ে বলা হয়, এই জমির ওপর মালিকানার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিমদের দেওয়া প্রমাণের চেয়ে হিন্দুদের দেওয়া প্রমাণের ভিত্তি অনেক বেশি শক্ত। আর্কিওলজি সার্ভে অব ইন্ডিয়া প্রমাণ পেয়েছে যে, মোঘল সম্রাট বাবরের ১৬ শতকের মসজিদ ফাঁকা জায়গায় নির্মাণ করা হয়নি। মুসলমানদের বিকল্প জায়গা দেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, মুসলিমরা মসজিদ পরিত্যক্ত করে দেয়নি। তাই মুসলিমদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পক্ষে অনুচিত হবে।
জমি ভাগ না করার বিষয়ে আদালত বলেছে, এলাহাবাদ হাইকোর্ট যেভাবে তিনটি ভাগে ঐ জমি ভাগ করেছিল তা অনৈতিক ছিল। এমনকি জনসাধারণের মধ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যে সমাধান হাইকোর্ট করেছিল- তা বাস্তবে সম্ভব নয়। রায়ে বলা হয়েছে, বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার ঘটনায় আইন লঙ্ঘন করা হয়েছিল। ঐভাবে মসজিদ ধ্বংস করাও অনুচিত ছিল।
বিভিন্ন হিন্দু সংগঠন এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলে বর্ণনা করে একে স্বাগত জানিয়েছে। রায় ঘোষণার পর গতকাল সুপ্রিম কোর্টে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে হিন্দু সংগঠনগুলোর সমর্থকদের জয়ধ্বনি দিতেও দেখা যায়। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক বিবৃতিতে বলেন, অযোধ্যা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বিচারবিভাগের ওপর আস্থা আবারও নিশ্চিত হবে। তিনি টুইটে বলেন, অযোধ্যা মামলার রায় কোনো পক্ষের জয় বা পরাজয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। সে রাম ভক্তি হোক বা রহিম ভক্তি, আমাদের একান্ত প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ভক্তির ওপর জোর দেওয়া।
ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও শীর্ষস্থানীয় বিজেপি নেতা রাজনাথ সিং রায়কে ‘ল্যান্ডমার্ক জাজমেন্ট’ বলে বর্ণনা করেছেন। দেশবাসীকে তিনি শান্তি ও সুস্থিতি বজায় রাখারও আহ্বান জানিয়েছেন। বিজেপির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। দেশটির প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেস রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। রায় মেনে নিয়ে সবাইকে শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
তবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অসন্তুষ্ট মামলার অন্যতম পক্ষ উত্তরপ্রদেশের সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড। রায় ঘোষণার পর অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের সদস্য জাফরিয়াব জিলানি জানিয়েছেন, এই রায়ের মধ্যে অনেক ‘স্ববিরোধিতা’ ও ‘তথ্যগত ভুল’ আছে। আমরা এখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করব। সবাই একমত হলে আমরা রিভিউ পিটিশন দাখিল করব। অবশ্য মামলার অন্যতম বাদী ইকবাল আনসারি রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি রায় চ্যালেঞ্জ করবেন না।