>> জাসিম উদ্দিন
মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো গতানুগতিক চিন্তার মধ্যে বেঁচে থাকা। এভাবেই মানুষ চলতে থাকে সারাজীবন। সভ্যতার বিকাশে রাখতে পারে না দৃশ্যমান কোন ভূমিকা। কিন্তু যারা গতানুগতিকতার বাইরে চিন্তা করে, তারাই সফল হয়। তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দেশে, এমনকি বিদেশে। তিনি পরিণত হন দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্বে। এমন গতানুগতিকতার বাইরেই চিন্তা করেছিলেন ডা. মোহাম্মদ আরিফ হোসেন। তিনি জাপানে বাস করেন। ডাক্তারি পাস করার পর ভেবেছেন, রোগ কেন হয়, এর প্রতিকার কিভাবে করা যায়। এ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। যিনি জাপানিজ সোসাইটি ফর ইনহ্যারিটেড মেটাবলিক ডিজিজ (জেএসআইএমডি) থেকে এ বছর শ্রেষ্ঠ সিনিয়র বিজ্ঞানী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
এর মাধ্যমে জাপানের ৬১ বছরের রেকর্ড ভাঙলেন তিনি। জন্ম দিলেন বিরল এক ঘটনার। বিগত বছরগুলোতে জাপানিরাই এ পুরস্কার জয় করেছেন। লাইসোসোমাল রোগের চিকিত্সাব্যবস্থা উদ্ভাবনের জন্য এ বছর তাকে এই বিরল স্বীকৃতির সনদ তুলে দেয় জেএসআইএমডি তাদের ৬১তম বার্ষিক সম্মেলনে। এছাড়া ২০১৭ সালে তিনি আন্তর্জাতিক আরো দুটি সম্মাননা পেয়েছেন। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়ায় আরিফ হোসেনের জন্ম। স্থানীয় স্কুল থেকেই দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। এরপর পা রাখেন ঢাকায়। মিরপুর বাংলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক, এরপর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। সেখান থেকে শিশু বিভাগে পোস্ট গ্র্যাজুয়েটও অর্জন করেন। পরে জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএসডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিশু নিউরো-মেটাবোলিক রোগে ক্লিনিক্যাল ফেলোশিপও অর্জন করেন সেখান থেকেই। বর্তমানে জাপানের অ্যাডভান্স ক্লিনিক্যাল রিসোর্স সেন্টার ও জিকে ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত আছেন। গবেষণা করছেন রোগের কারণ নিয়ে। বেশিরভাগ মানুষ রোগ হলেই ছুটে যায় ডাক্তারের কাছে। কিন্তু রোগের কারণ নিয়ে ভাবে না। আর এ বিষয়টিই ভাবায় আরিফকে। তিনি জানতে চান, জেনেটিক কী কারণে মানুষের শরীরে রোগ বাসা বাঁধে, মানুষ অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়। শুধু মানুষের চিকিত্সা না করে তার রোগের জন্মরহস্যের কারণ অন্বেষণ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন আরিফ।
গতানুগতিক চিকিত্সা পেশায় না গিয়ে গবেষণায় কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি একজন গতানুগতিক চিকিত্সকই বটে। উন্নত বিশ্বে প্রায় সব চিকিত্সকেরই নিজস্ব গবেষণা থাকে, বলতে পারেন ফিজিশিয়ান কাম রিসার্চার। আমি আসলে একজন শিশু নিউরো-মেটাবলিক রোগ বিশেষজ্ঞ। নিউরো-মেটাবলিক রোগ সাধারণত জেনেটিক কারণে হয়। তার মানে, মায়ের পেট থেকে জিন নিয়ে বের হয়; পরবর্তীতে ব্রেন, লিভার, কিডনি, হার্টসহ নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। এই রোগীদের সংখ্যা নেহাত কম নয়, কিন্তু এদের নিয়ে গবেষণা খুব কম হয়েছে। তাই আমি সেগুলো নিয়ে গবেষণা করে আনন্দবোধ করি।’
ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আরো উচ্চতর গবেষক হতে চাই। বর্তমানে আইপিএ সেল নিয়ে কাজ করছি। তা হলো নিজের শরীরের কোষ নিয়ে নিজের চিকিত্সা করা। যেমন, যার লিভার নষ্ট হয়ে গেছে, তার স্কিন থেকে সেল নিয়ে সেই সেল থেকে লিভার সেল বানিয়ে তার শরীরে আবার দেওয়া। তাছাড়া যাদের ব্রেনের অসুখ হয়, যাদের ব্রেন সেল নষ্ট হয়। শরীরের অন্য কোনো সেল নিয়ে মোডিফাই করে ব্রেন সেল বানিয়ে তার চিকিত্সার জন্য কাজ করা।’ গবেষণাকে তিনি সব মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে চান। তিনি আরো বলেন, ‘যেহেতু আমি আমার গবেষণাগারের প্রধান বিজ্ঞানী, তাই আমি চাই, বাংলাদেশের যে সমস্ত কঠিন রোগ আছে, সেগুলোর স্যাম্পল নিয়ে এসে বিনামূল্যে ডায়াগনোসিস করতে।’
তরুণ চিকিত্সকদের প্রতি তার পরামর্শ জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি শুধু তরুণ ডাক্তারদের উদ্দেশে বলব না। আমি বাংলাদেশের সব ডাক্তারের উদ্দেশেই বলব, গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। একজন ডাক্তার যখন গবেষণায় যুক্ত থাকবে না, তখন তার জন্য যে চিকিত্সা দিচ্ছে, রোগী আসছে, প্রেসক্রিপশন দিচ্ছে, রোগ ভালো হচ্ছে অথবা ভালো হচ্ছে না—এর কারণ কী—এগুলো বুঝতেও অসুবিধা হবে। সারাজীবনই কি অন্যের গবেষণার ওপর নির্ভর করবেন? যে রোগগুলোর ডায়াগনোসিস হচ্ছে না, রোগীকে বাইরের দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন, তাদের ডায়াগনোসিসের দায়িত্ব কি আমরা কোনোদিনও নেব না?’