জানা-অজানা

পৃথিবীর সুন্দরতম পাহাড়

রসায়ন ও প্রকৃতির মিশ্রণে এক বিরল পাহাড় রেইনবো মাউনটেন। চীনের উত্তর-পশ্চিম গানসু-র জাংগেতে এর অবস্থান। ছবি দেখলে মনে হবে ক্যানভাসে কোনো শিল্পী মনের মাধুরী মিশিয়ে এঁকেছেন। রংধনুর মতো রং ছড়িয়ে আছে পাহাড়জুড়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫০০ মিটার উচ্চতায় ২০০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে পাহাড়ে রঙের খেলা, রঙিন পাহাড়! এখানকার সবগুলো পাহাড়ই রঙে আবৃত। প্রকৃতির এই অভাবনীয় রূপ, অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে ভিড় করেন প্রকৃতিপ্রেমিরা।

বালি পাথর, পলি পাথর, আয়রন অক্সাইড, আয়রন সালফাইড, ক্লোরাইডসহ বিভিন্ন খনিজ পদার্থ পাওয়া যায় এখানে। এসব খনিজ থেকেই বিভিন্ন রঙে উত্পত্তি। গবেষকরা এই পাহাড়ের মাটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধারণা করেছেন প্রায় ৫৫ মিলিয়ন বছর আগে হিমালয়ের অনেক আগে এই পাহাড় গড়ে উঠেছে। দুটি গাড়ি দুর্ঘটনার পর গাড়ির বাম্পারগুলো যেমন ভাঁজ হয়ে যায়, ঠিক তেমনি পাহাড়গুলোর উপরিভাগ ভাঁজ করা। দীর্ঘদিন ধরে আবহাওয়া পরিবর্তন আর রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে পাহাড়গুলোতে নানা ধরনের রং সৃষ্টি হয়েছে, যা রংধনুর মতো দেখায়। বালি পাথরগুলোর ওপরে পাললিক পাথর বা বালিকণাগুলোর রসায়নেই মূলত বিভিন্ন রং তৈরি হয়। এখানকার বিভিন্ন খনিজ পদার্থ বালিকণাগুলোর সঙ্গে মিশে রঙের মারাত্মক প্রকরণ তৈরি করে। পাহাড়টির মূল উপাদান হলো লাল বালি পাথর। এতে আয়রন অক্সাইডের প্রলেপ থাকে। এটি হেমাটাইট নামেও পরিচিত। বৃষ্টির পানি আয়রনের সংস্পর্শে মরীচিকা হয়ে ওঠে। খোলা আবহাওয়া, জলীয় বাষ্পের সংস্পর্শে আয়রন অক্সাইড গাঢ় লাল বর্ণসহ বিভিন্ন রং ধারণ করতে পারে। জারনযুক্ত লিমনাইট বালির পাথর হলুদ বাদামি দাগ তৈরি করে। ম্যাগনেটাইট বালির পাথর কালো দাগ তৈরি করতে পারে। আয়রন সালফাইড হলুদ রং ধারণ করে। ক্লোরাইট বা লোহার সিলিকেট ক্লে ধারণ করে সবুজ রং। বিভিন্ন রঙের সমারোহে পাহাড় সাজে এক ভিন্ন আঙ্গিকে।

২০০৫ সালে ৩৪টি প্রধান মিডিয়ার একদল রিপোর্টার চীনের সুন্দরতম ভূপৃষ্ট অঞ্চল হিসেবে রেইনবো মাউনটেইনকে নির্বাচন করেন। ২০০৯ সালে চাইনিজ ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ৬টি সুন্দর ভূপৃষ্ট (ল্যান্ডফর্ম)-র মধ্যে রেইনবো মাউনটেইনকে পছন্দ করে। এভাবে পত্র-পত্রিকা, মিডিয়ায় আলোচনায় আসার পর থেকে দর্শনার্থীর ভিড় দিনদিন বেড়েই চলেছে। ভ্রমণপিপাসুদের কথা চিন্তা করে পাহাড়গুলোতে পায়ে হাঁটার উপযোগী বেশকিছু রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। ইউনেস্কো ২০১০ সালে রেইনবো মাউনটেইনকে বিশ্ব ইতিহাসের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে।

পৃথিবীর সকল পাহাড়ই সুন্দর। অধিকাংশ সুন্দর পাহাড়ই গভীর সবুজে ঢাকা। অরণ্যের ঝকঝকে সবুজ বা ফ্যাকাসে সবুজের আবেশে নিথর পাহাড় দাঁড়িয়ে থাকে, আকাশের নীল উঁকি দেয় সবুজের ফাঁকে ফাঁকে। অথচ এই রেইনবো মাউনটেইনে শুধু সবুজ নয়, নিজে নিজেই ডজনখানেক রং তৈরি করে রংধনুর মতো সৌন্দর্যপিপাসুদের মন-প্রাণ কেড়ে নেয় নিজের রঙিন আবরণ দিয়ে।