জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত নিকি হেলি শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন না যে ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রেসিডেন্ট অভিশংসিত হওয়ার মতো কোনো অপরাধ করেছেন। যদিও তিনি জনসম্মুখে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তিনি হলেন অল্প কিছু প্রশাসনিক সদস্যের একজন, যিনি ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু শুক্রবারের এই মন্তব্যে তার রাজনৈতিক অঙ্ক নিয়ে গভীর প্রশ্ন উঠে এসেছে। নোরাহ ও ডোনেলের উপস্থাপনায় সিবিএস টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে হেলি বলেছেন, ‘আপনারা একজন প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করতে চাইছেন তার ইউক্রেনের কাছে একটি সহায়তা চাওয়ার জন্য, যেটা বাস্তবে ঘটেনি এবং অর্থ প্রদানের ব্যাপারে, যেটা ইতিমধ্যেই বন্ধ আছে। আমি জানি না কীসের ভিত্তিতে তাকে ইমপিচ করতে চাইছেন।’
এমন একটি সময় যখন ট্রাম্প ও ইউক্রেনের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে এবং আগামী সপ্তাহেই যার শুনানি শুরু হবে, তখন হেলির এই মন্তব্য হাস্যকরভাবে উড়িয়ে দেওয়ার মতো। এই সিদ্ধান্তের পেছনে আমেরিকার সাধারণ মানুষ নেই—এমন প্রশ্ন তুলে হেলি ট্রাম্পকে অদ্ভুত ধরনের এক সমর্থন দিতে চেষ্টা করেছেন। হেলি বলেছেন, ‘আমি মনে করি, এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে শুধু আমেরিকার জনগণ। এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড়ো চিন্তা। আমাদের কংগ্রেসে থাকা একদল লোক কেন এই সিদ্ধান্ত নেবে?’
ট্রাম্প প্রশাসনের এই সাবেক কর্মকর্তা এবং দক্ষিণ ক্যারোলাইনার গভর্নর কি স্মৃতিবিলোপ রোগে ভুগছেন? অথবা তিনি কি বুঝতে পারছেন না যে সংবিধান অনুসারে ইমপিচ করার এই দায়িত্বটি কংগ্রেসেরই? অথবা বিষয়টি কি এমন যে তিনি একটি চাল চেলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নতুন ভাইস প্রেসিডেন্ট পদটির প্রতি লক্ষ্য রেখে; ঢুকতে চাইছেন ওভাল অফিসে? তার নিজের উদ্দেশ্যকে যদি বাদ দেওয়া যায়, তার পরও বলা যায় যে কেন তিনি চেষ্টা করছেন প্রেসিডেন্টকে সমর্থন করতে, যে প্রেসিডেন্ট তার প্রেসিডেন্সি নিয়ে যৌক্তিকভাবেই একটি গভীর সংকটের মধ্যে পড়েছেন। ট্রাম্প অন্যের ওপর দোষ চাপানো এবং রদবদল করার ব্যাপারে যথেষ্ট কুখ্যাত। সুতরাং ট্রাম্প ইউক্রেইনের ব্যাপারে একজন দুর্ভাগাকে খুঁজছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত গর্ডন সোন্ডল্যান্ড এবং ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী রুডি গুইলিয়ানির পাশাপাশি ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সও এই তালিকায় থাকতে পারেন, যাকে ট্রাম্প ধাক্কা দিয়ে বাসের নিচে ফেলে দেবেন। যদি পেন্স দৃশ্যপট থেকে অপসারিত হন, তাহলে হেলি টুক করে তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে যেতে পারেন। আর ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেই ফেলেন, তাহলে ধারণা করুন, ‘ম্যাডাম প্রেসিডেন্ট’-এর টাইটেলটা কে আঁকড়ে ধরবেন?
হেলির সাক্ষাত্কারের সবচেয়ে মজার অংশ হলো, তিনি ট্রাম্পের সম্ভাব্য অভিশংসনকে মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করেছেন। হেলি ও ডোনেলকে বলেছেন, ‘একজন জনপ্রতিনিধিকে ইমপিচ করার মানে হলো তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া। তুমি যদি ট্রান্সক্রিপ্টের (ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ট্রাম্পের কথোপকথনের অনুলিপি) দিকে তাকাও, দেখবে সেখানে এমন কিছু নেই, যার কারণে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে।’
এই ক্ষুব্ধ করার মতো তুলনাই হলো আলোচনার মতো বিষয়। ট্রাম্পকে ইমপিচ করার অর্থ হলো তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ব্যাপারে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা। এটা মৃত্যুদণ্ডের মতো ভয়ানক কোনো বিষয় নয়। একজন সাবেক গভর্নর এবং জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের পদে দায়িত্ব পালন করা একজন মানুষের এই ইমপিচমেন্টের ঘটনাকে এমন মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করাটা কেবল হেলির বোঝার অক্ষমতাকেই প্রমাণ করে।
হেলির এই বিষয়টিই গায়ক জন লিজেন্ড টুইটারে সংক্ষেপে তুলে এনেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘মাইক পেন্স কি ট্রাম্পের বলির পাঁঠা হতে যাচ্ছেন?’
লিজেন্ড টুইটারে বলেছেন, ‘এটা মৃত্যুদণ্ড নয়, এটা হলো দেশের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে তাকে অপসারণের প্রয়াস। কারণ এই পদের জন্য তাকে বিশ্বাস করা যায় না। বাস্তবের লোককে সাধারণত মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এটা সেরকম বিষয় নয়।’
রিজেন্ড হেলিকে ধাক্কাটা দেওয়ার আগে তাকে উজ্জ্বল মানুষ বলে বর্ণনা করেছেন। তারপর বলেছেন, ‘আপনি পরিষ্কার জানেন যে তিনি নৈতিকভাবে এবং বুদ্ধিমত্তার দিকে দিয়ে এই পদের জন্য উপযুক্ত নন। আমি মনে করি, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এবং আপনার ব্যক্তিগত সুনামের স্বার্থে এ কথা আপনার স্বীকার করে নেওয়া উচিত।’
লিজেন্ড ঠিক কথাই বলেছেন এবং তিনি ঠিকই মাথায় পেরেক ঢুকিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে, তিনি যখন তাকে উজ্জ্বল মানুষ বলে উল্লেখ করেছেন। তার পেশাগত বৃত্তান্তের দিকে তাকিয়ে দেখুন। সেটা দেখলেই বোঝা যাবে যে ট্রাম্পের অধীনে হেলির এমন একটি পদ নিতে কোনো সমস্যাই নেই, যে পদটি কেবল দেখানোর জন্য। ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতি অবজ্ঞা এবং কূটনৈতিক তত্পরতা উপেক্ষার কথা সবাই জানে। হেলি জেনেশুনেই রাষ্ট্রদূতের পদটি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ভালো করেই জানতেন যে ট্রাম্পের অধীনের আমেরিকা কখনোই জাতিসংঘে কোনো বিনিয়োগ করবে না। সুযোগ পেয়ে হেলি পদটি গ্রহণ করেছিলেন এই বিশ্বাসে যে তিনি হয়তো সত্যিকারের ভালো কিছু কাজ জাতিসংঘে করতে পারবেন। কিন্তু সবাই জানে না যে, বিষয়টি যখন ট্রাম্পের হাতে, তখন এটা তার পথ ধরে চলবে নাকি মহাসড়ক ধরে চলবে।
হেলির সাক্ষাত্কারের এই অংশটি এবং এই মুহূর্তে তার রাজনৈতিক ভাষ্য নিয়ে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টিই ছিল তিক্ত। এর থেকে আমার ধারণা হয়েছে যে, আমেরিকার রাজনীতির সমস্যা ট্রাম্প না, বরং নিকি হেলির মতো মানুষেরা, যারা ট্রাম্প এবং ট্রাম্পের দুর্নীতির সংস্কৃতিকে সজীব রেখেছেন।
(ইংরেজি থেকে অনূদিত)
n লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ