আসুন, পরিবারকে ডায়াবেটিসমুক্ত রাখি

আজ ১৪ নভেম্বর, বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। ১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস পালনের কারণ হলো—এই দিনের ফ্রেডরিক ব্যান্টিং জন্মগ্রহণ করেন। যিনি তার সহযোগী চার্লস বেল্টকে সঙ্গে নিয়ে অধ্যাপক ম্যাকয়িডের গবেষণাগারে ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণের মহৌষধ ইনসুলিন আবিষ্কার করেন।

ডায়াবেটিস বর্তমানে একটি মহামারি রোগ হিসেবে চিহ্নিত এবং এই রোগ সারা জীবনের রোগ। নিয়ন্ত্রণে থাকলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের জটিলতা অনেক। ডায়াবেটিসের এত সব জটিলতার কথা চিন্তা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতি বছরের মতো এবারও একটি বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এই দিবসটি পালনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে ডায়াবেটিস রোগের লক্ষণ, চিকিত্সা ও নিয়ন্ত্রণ রাখার ব্যবস্থা সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ডায়াবেটিক ফেডারেশনের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ১৯৮৫ সালের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ কোটি, আর এখন সেটা দাঁড়িয়েছে ৩৭ কোটিতে। সারা বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগী বাড়ছে। ডায়াবেটিস আজ পৃথিবীব্যাপী মহামারি। উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বৃদ্ধির হার বেশি। ২০০৩ সালে সারা বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগী ছিল ১৯ কোটি। আগামী ২০৩০ সালে তা বেড়ে দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। একইভাবে বাংলাদেশে গত ২০০৩ সালে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল ৫০ লাখ এবং আগামী ২০৩০ সালে তা বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার ১-২৮ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার মহিলাদের মধ্যে এ হার ২৫ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আক্রান্তের হার ৬-১৪ শতাংশ। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মহিলাদের মধ্যে ৬৫ শতাংশের পরবর্তী গর্ভধারণের সময়ে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস দেখা দেয়।

উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ডায়াবেটিসকে মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ হিসেবে  ধরা হয়। সুতরাং  প্রতিদিন যেমন ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি বাড়ছে ডায়াবেটিস রোগীদের নানা ধরনের জটিলতা। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে বিশ্বে ডায়াবেটিসকে মহামারি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন তা হচ্ছে—দৈনন্দিন জীবনে আমাদের শারীরিক সক্রিয়তা কম এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ না করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বংশগত কারণ ছাড়াও নগরায়ণ ও পরিবর্তিত জীবনধারণের কারণেই ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের প্রায় অর্ধেক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। এমনকি অপরিকল্পিত গর্ভধারণের কারণে শিশু অপুষ্টির শিকার হলে এবং সেই শিশু পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর অতিরিক্ত ওজন হলে তার ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বহু গুণ বেশি থাকে। বাংলাদেশে প্রায় ৫০ শতাংশ গর্ভধারণ অপরিকল্পিত এবং ২৫ শতাংশ অনাকাঙ্ক্ষিত। প্রতি ১ হাজার শিশুর মধ্যে মৃত্যুহার ৪৫.৬৭ শতাংশ। জন্মক্রটিপূর্ণ শিশুর জন্মহার ২.৪ শতাংশ এবং কম ওজনের শিশুর জন্মহার ৪০ শতাংশ। বর্তমানে নগরায়ণের ফলে পরিবর্তিত জীবনযাপনের কারণে সারা বিশ্বেই ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। তবে বৃদ্ধির এই হার উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও বেশি।

আপনার বয়স যদি ৪০-এর বেশি, ওজন যদি মাত্রাতিরিক্ত হয় কিংবা বংশে যদি কারো ডায়াবেটিস থাকে তবে অবশ্যই বছরে একবার ডায়াবেটিসের পরীক্ষা করাবেন এবং সেই সঙ্গে গর্ভবতীরা নিশ্চিত করবেন তাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আছে কি না।

৫০ শতাংশের বেশি টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধযোগ্য। আজ থেকে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করুন। কারণ অঙ্গহানি, হূদরোগ, কিডনি জটিলতা ও অকাল মৃত্যুর অন্যতম কারণ ডায়াবেটিস। সামান্য উদ্যোগই রোগের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারে।

প্রত্যেক ডায়াবেটিস রোগী যদি তিনটি  D- Diet, Drug, Discipline অর্থাত্ পরিমিত খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ এবং রক্ত পরীক্ষা ও ব্যায়াম—এই তিনটি নীতিকে নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিদিন মেনে চলেন তাহলে তারা অবশ্যই স্বাভাবিকের কাছাকাছি, সামাজিকভাবে উপযোগী, সৃজনশীল কাজে সক্ষম ও সম্মানজনক জীবন নির্বাহ করতে পারবেন।

লেখক :শব্দসৈনিক, একুশে পদকপ্রাপ্ত,

সাম্মানিক উপদেষ্টা, বারডেম হাসপাতাল