প্রায় ৬০ ঘণ্টার ঘূর্ণিঝড় বুলবুল সরকারি মতে ২০টি এবং বেসরকারি মতে আরো বেশি প্রাণ নিয়ে চলে গেল, পশ্চিমবঙ্গের তিনটি জেলায় দুই চব্বিশ পরগনা, মেদিনীপুর ও কলকাতার কিছু অংশে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ প্রায় ৫ লাখ। ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার বাড়ি। চাষের ক্ষতি হয়েছে বিপুল, তার সঠিক তথ্য এখনো সরকারের হাতে আসেনি। এই ঘূর্ণিঝড়ের জন্য কেন্দ্রসরকার রাজ্যসরকারকে সব রকম সাহায্য দেবে বলে প্রধানমন্ত্রী মোদি মমতাকে জানিয়েছেন।
আবহাওয়া দপ্তর থেকে মিনিটে মিনিটে যে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছিল তা কখনো মেলেনি, আবার কখনো মিলেছে, শনিবার মধ্যরাত থেকে বাংলাদেশের সুন্দরবনে আছড়ে পড়েছে ঘূর্ণিঝড়। একদিকে সাগরদ্বীপ অন্যদিকে বাংলাদেশের খেপুপাড়া। এর মধ্যদিয়েই বঙ্গোপসাগর থেকে ঢুকেছে তীব্র ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। দুর্যোগ মোকাবিলায় শুক্রবার থেকেই ব্যাপক তত্পরতা, সাগরদ্বীপ, কাকদ্বীপ, নামখানাসহ উপকূলবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছিল। মত্স্যজীবীদের দ্রুত ঘরে ফেরার জন্য অহরহ মাইকে প্রচার করা হয়েছে। সোমবারেও মত্স্যজীবীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রাখা হয়েছে। বহু মানুষকে ইতোমধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির ফলে দুই চব্বিশ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর এমনকি কলকাতাতেও জোয়ারের জলের চেয়ে এক-দুই মিটার বেশি উঁচুতে জলোচ্ছ্বাস পৌঁছতেই ২০০৯ সালের আয়লার ভয়াবহতার স্মৃতি সবার মনে আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছিল। এবার কোটাল গতি পাওয়ার সময়ই ঘূর্ণিঝড়। কদিন পরেই রাসপূর্ণিমা, শনিবার ছিল দ্বাদশী। রাত আটটা নাগাদ জোয়ার সুন্দরবনের নদীগুলোতে থাকবে বলে বুলবুলের গতিরোধের ওপর নজর রাখার জন্য পারাদ্বীপ ও গোপালপুরে প্রস্তুত ছিল ওয়েদার ডপলার রাডার।
কিন্তু এই ৬০ ঘণ্টার বুলবুল পশ্চিমবঙ্গকে শুধু তছনছ করে গেল না, ডুবল পাকা ধান ও ক্ষতি আনাজেরও। কতটা ক্ষতি হয়েছে তার সর্বশেষ তথ্য এই লেখার সময় পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হাতে এসে পৌঁছায়নি; কিন্তু রাজ্যের কৃষি দপ্তর বলছে— আর কিছুদিন পর থেকেই আমন ধান কাটা শুরু হওয়ার কথা; কিন্তু পাকা ধানে ‘মই’ দিল বুলবুল, বহু খেতের ধানগাছ শুয়ে পড়েছে। ঝরে গেছে শিষ, জমিতে বৃষ্টির জল জমে নষ্ট হয়েছে আনাজ, পান, ফুলচাষও।
এখনো শীত পড়েনি, তবু বাজারে শীতের আনাজ আসা শুরু হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে নাগালে আসতে শুরু করেছিল দামও; কিন্তু বুলবুলের দাপটে দুই চব্বিশ পরগনা, হাওড়া, হুগলী ও পূর্ব মেদিনীপুরের চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। কতটা ফসল তারা বাঁচাতে পারবে তা নিয়ে চাষিরা দিশেহারা। ক্ষয়ক্ষতির হিসেব কষা শুরু করেছে কৃষি দপ্তর।
রাজ্য সরকারের শীর্ষস্তর থেকে জানা গেছে, জলেডোবা ধান বাঁচাতে কৃষিবিজ্ঞানীদের সঙ্গে পরামর্শ করছে কৃষি দপ্তর। মুখ্যমন্ত্রীর কৃষি উপদেষ্টা প্রদীপ মজুমদার বলেন, ‘গোটা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন। আমাদের প্রাথমিক কাজ ক্ষয়ক্ষতি আটকানো, কৃষকদের আতঙ্কিত না হতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বুলবুলের দাপট সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া গেছে দুই চব্বিশ পরগনায়। যে দুই জেলা কলকাতাসহ আশপাশের অঞ্চলে আনাজের বড়ো জোগানদার। ফলে বাজারে শীতের আনাজের আকালের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উত্তর চব্বিশ পরগনার ১ লাখ ৩ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। ধান, আনাজের সঙ্গে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে পেঁপেগাছেরও। জেলার ক্ষতিগ্রস্ত চাষির সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডাঙর, ক্যানিং, বাসন্তী, পোনাবা, জয়নগর, কুলতলিসহ বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বাঁধাকপি, ফুলকপি, পালং, ক্যাপসিকাম বাইরে রপ্তানি শুরু হয়েছিল; কিন্তু ঝড়ের দাপটের সঙ্গে ব্যাপক বৃষ্টিতে আনাজের জমি পানির নিচে চলে গেছে। কাকদ্বীপ, নামখানা ব্লক এলাকায় ৬০ শতাংশ পানবরজ নষ্ট হয়েছে বলে কৃষি দপ্তর সূত্রে খবর।
বুলবুলের পরে পশ্চিমবঙ্গ আরেক বিপদের সম্মুখীন হয়েছে, তা হলো প্রায় মহামারি রূপে আবার ডেঙ্গির আর্বিভাব। সোমবার সকালেই স্বাস্থ্য দপ্তরের এক মুখপাত্র স্বীকার করে নিয়ে সমস্ত পশ্চিমবঙ্গে সরকারি হাসপাতালে ৬০ থেকে ৭০ হাজার ডেঙ্গি রোগী ভর্তি হয়েছে গত তিন-চার দিনে। বেসরকারি মতে—এর সংখ্যা আরো বেশি। সরকারি হাসপাতালের কর্তারা বলছেন, প্রতি তিন জন রোগীর মধ্যে এক জন করে ডেঙ্গি রোগী। আবার স্থানীয় কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে—তারা সরকারি হাসপাতালে নিয়ে ডাক্তারদের হুমকি দিয়ে বলছেন, ডেঙ্গিতে মারা গেলে তা লিখবেন না। বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়াতে সংবাদ মাধ্যমে এই নিয়ে হইচই পড়ে গেছে। বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমে কতসংখ্যক রোগী ভর্তি আছে সে তথ্যও সংবাদমাধ্যমকে জানাতে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে। এ যেন গোদের ওপর বিষফোড়া। পরিস্থিতি কোনদিকে যাবে তা মুখ্যমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীপরিষদ জানে না। কিছু ঘটলে তা চেপে দেবার গোপন মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গির প্রতিষেধক কোনো ওষুধ নেই। বুলবুলের জমে যাওয়া পানিতে আবার মশার লার্ভার বংশ বিস্তার হবে। এই হলো পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান হাল।
n লেখক : কলকাতার সিনিয়র সাংবাদিক