ক্ষুদ্রঋণে দারিদ্র্য লালন পালন হয় :প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের সমালোচনা করে বলেছেন, এর মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন হয় না, বরং দারিদ্র্য ‘লালনপালন’ করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) আয়োজিত ‘উন্নয়ন মেলা ২০১৯’ উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। 

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘একসময় আমরা দেখেছি, ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে (কর্মসূচি) কেউ কেউ খুব বাহবা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। একসময় আমরাও এটাকে সমর্থন দিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম যে এর মাধ্যমে বুঝি মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারবে। কিন্তু যখন আমরা বিষয়টা আরো গভীরভাবে দেখলাম, তাতে দেখলাম, আসলে এর মাধ্যমে দারিদ্র্য ঠিক বিমোচন হয় না। কেউ কেউ এর প্রবক্তা হিসেবে নাম-যশ কামালেও বাস্তবতা হচ্ছে যে দেশের জনগণ এর অতটা সুফল পায়নি।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ক্ষুদ্রঋণটা স্বাধীনতার পরপরই জাতির পিতা শুরু করেছিলেন। যদিও আমাদের দেশে কেউ কেউ ক্ষুদ্রঋণের প্রবক্তা সেজে বিশ্বে ভালো নামটামও করে ফেলেছেন। কিন্তু দেখা গেছে, হয়তো নিজে যতটা নাম কামিয়েছেন দেশের মানুষ ততটা শুভ ফল পায়নি, এটা হলো বাস্তব।’ তিনি বলেন, মানুষকে কীভাবে সমবায়ের মাধ্যম একত্রিত করে উত্পাদন বৃদ্ধি এবং উত্পাদিত পণ্য বাজারজাত করে তাদেরকে কীভাবে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে আনবেন, সেই পরিকল্পনাটাই জাতির পিতা নিয়েছিলেন।’

‘২১ বছর পর দেশ পরিচালনায় এসেই আওয়ামী লীগ সরকার দারিদ্র্যকে দেশের প্রধান শক্র হিসেবে চিহ্নিত করে’—উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দারিদ্র্যের বিরুদ্ধেই আমাদের লড়তে হবে এবং মানুষকে মুক্তি দিতে হবে। সে লক্ষ্যে আমাদের স্বল্পমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি এবং আশু পরিকল্পনা প্রণয়ন করি।’

শেখ হাসিনা বলেন, যখন মিলিটারি ডিক্টেটররা ক্ষমতায় থাকে তখন সরকার থাকে দুর্বল। কেননা তাদের কোনো ভিত্তি থাকে না। অর্থাত্ জনগণের কোনো শক্তি থাকে না। সে সরকারব্যবস্থা অপরের কাছে হাত পেতে চলে, নিজেদের সম্পত্শালী করে গড়ে তোলে, ফলে দেশের মানুষ দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণায় দিনের পর দিন ভুগতেই থাকে। জনগণের দিকে তাকানোর কেউ থাকে না।

জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে গ্রামীণ জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তার সরকারের চালু করা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিভিন্ন কর্মসূচি, যেমন—বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ততা ভাতা চালু, গরিবদের মধ্যে  খাদ্য বিতরণ, কৃষকদের মধ্যে বিনা মূল্যে এবং স্বল্পমূল্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, বর্গাচাষিদের বিনা জামানতে এবং স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানের মতো কর্মসূচির উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার নির্দেশ ছিল কৃষি ব্যাংক গ্রামে কৃষকদের কাছে চলে যাবে। হাটবারে গ্রামের হাটে বসে ঋণ প্রদান করবে এবং সেখান থেকেই আবার ঋণ সংগ্রহ করবে। এভাবেই আমরা কৃষকদেরকে সহযোগিতা করেছি।’ কৃষকদের জন্য ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, কৃষি উপকরণ কার্ড প্রদান, বিএডিসিকে আরো উন্নত করে উন্নত মানের বীজ উত্পাদন ও বিতরণের উল্লেখ করেন তিনি। ‘ঘরে ফেরা’, ‘আমার বাড়ি আমার খামার’, ‘আশ্রয়ণ’সহ বিভিন্ন দারিদ্র্যবান্ধব কর্মসূচির উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশকে ভিক্ষুকমুক্ত করার জন্য সরকার এ ধরনের বিভিন্ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ভূমিহীনদের জমি দিয়েছি। যারা গৃহহারা তাদের ঘর করে দিয়েছি এবং দিচ্ছি। মানুষ যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে সে ব্যবস্থা আমরা করেছি।’

তিনি বলেন, জাতির পিতা একটি কথা বলতেন, ভিক্ষুক জাতির কোনো ইজ্জত থাকে না। আমরা ভিক্ষুক জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাই না। আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। তার সরকারের সময়ে দেশের অভূতপূর্ব আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য বহির্বিশ্বে তাকে অনেক অনুসন্ধিত্সু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে গেলে আমাকে প্রশ্ন করা হয়—বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতির ম্যাজিকটা কী? আমি তাদের বলি, আসলে কোনো ম্যাজিক নেই। দেশকে ভালোবাসা, দেশকে জানা এবং দেশের মানুষের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করা—এটাই হলো মূল ম্যাজিক।’

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন এবং পিকেএসএফ চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মইনুদ্দিন আবদুল্লাহ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে কৃষকদের কল্যাণ ও দারিদ্র্য নিরসন এবং কৃষির উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য সাবেক কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সম্মাননা স্মারক মতিয়া চৌধুরীর হাতে তু্রলে দেন।