মুক্তা চাষ

ঝিনুক আমাদের দেশে একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। মাছ চাষের পাশাপাশি ঝিনুক চাষ করে আমরা পেতে পারি মহামূল্যবান বস্তু মুক্তা। এতে জলাশয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব। মুক্তা জীবন্ত ঝিনুকের দেহের ভেতরের জৈবিক প্রক্রিয়ায় তৈরি এক ধরনের বস্তু। কোনো বাহ্যিক বস্তু ঝিনুকের দেহের ভেতরে ঢুকে নরম অংশে আটকে গেলে আঘাতের সৃষ্টি হয়। ঝিনুক এই আঘাতের অনুভূতি থেকে উপশম পেতে বাইরে থেকে প্রবেশকৃত বস্তুটির চারিদিকে এক ধরনের লালা নিঃসরণ করতে থাকে। ক্রমাগত নিঃসৃত এই লালা বস্তুটির চারিদিকে ক্রমান্বয়ে জমাট বেঁধে মুক্তায় পরিণত হয়। ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) দেশে প্রথমবারের মতো ইমেজ (প্রতিছবি) মুক্তা চাষে সফলতা পেয়েছে। মিঠা পানির ঝিনুক থেকে পাখি, মাছ, নৌকাসহ বিভিন্ন বস্তুর নকশার দৃষ্টিনন্দন ইমেজ মুক্তা উত্পাদনে উক্ত প্রতিষ্ঠান সফলতা অর্জন করে। উদ্যোক্তা এবং গ্রামীণ পর্যায়ে এ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি রপ্তানি খাতে ও ব্যাপক সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে আরো জানা যায়, অতীতে আমাদের দেশে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর পরিমাণে মুক্তা উত্পাদিত হত।

পৃথিবীর ইতিহাসে ১৮৯০ সালে জাপানে এক বিজ্ঞানী কোকিচি মিমিমোতো সর্বপ্রথম প্রণোদিত উপায়ে মুক্তা চাষ করে সফল হন। বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৯৯ সালে মিঠা পানিতে মুক্তা চাষের পরীক্ষামূলক গবেষণা শুরু করে। প্রণোদিত উপায়ে ঝিনুক থেকে মুক্তা চাষ প্রযুক্তি অনেকটা সূচি শিল্পের মতো। যা গ্রামীণ নারীরা সহজে আয়ও করতে পারে। দেখা গেছে গ্রামীণ নারীরা মাত্র তিন-চার দিনের প্রশিক্ষণে ঝিনুক অপারেশনে দক্ষ হয়ে উঠে। তাই মুক্তা চাষে নারীদের নিয়োজিত করা গেলে জলাশয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহারের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব। বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০১২ সালে মুক্তা চাষ প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ নামক একটি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু করে। এই প্রকল্পের আওতায় মিঠা পানির ঝিনুকের ওপর মুক্তাবিষয়ক বিভিন্ন ধরনের গবেষণা কাজ পরিচালিত হচ্ছে। তিন ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা মুক্তা পেতে পারি। ম্যান্টল টিস্যু অপারেশন পদ্ধতি: ঝিনুক থেকে মুক্তা তৈরির জন্য ঝিনুকের দেহের ভেতরে ম্যান্টল টিস্যু প্রবেশ করানো হয়। বর্তমানে বিজ্ঞান সম্মতভাবে ঝিনুক থেকে মুক্তা তৈরিতে ম্যান্টল টিস্যু অপারেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। সুন্দর ও আকর্ষণীয় মুক্তা তৈরির জন্য ঝিনুকে স্বল্প সময়ের মধ্যে নির্ধারিত আকারের ম্যান্টল টিস্যু প্রবেশ করাতে হবে। একটি ঝিনুকে মুক্তা তৈরি করতে অপর একটি ঝিনুকে কেটে ফেলতে হয়। প্রথমে একটি ঝিনুককে কেটে ম্যান্টল টিস্যুর বহিঃ ত্বক লম্বা করে কেটে বিচ্ছিন্ন করতে হয়। বিচ্ছিন্ন করা টিস্যুটিকে লম্বা করে একটি গ্লাস বোর্ডে রাখতে হয়। লম্বা টিস্যুকে পরে (দুই-তিন) মিমি আকারে টুকরো করে কাটতে হয়। এর পর টুকরো করা ম্যান্টল টিস্যু অন্য একটি জীবিত ঝিনুকে স্থাপন করতে হয়। এভাবে অপারেশন প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়। নিউক্লিয়াস অপারেশন পদ্ধতি: নিউক্লিয়াস অপারেশন পদ্ধতি এবং ম্যান্টল টিস্যু অপারেশন পদ্ধতি মোটামুটি একই রকম। এই পদ্ধতিতে ঝিনুকের ভেতরে একসঙ্গে ম্যান্টল টিস্যু ও নিউক্লিয়াস প্রবেশ করানো হয়।

নিউক্লিয়াসের ওপর মুক্তার প্রলেপ পড়ে এবং নিউক্লিয়াসকে ঘিরে মুক্তা তৈরি হয়। ইমেজ মুক্তা অপারেশন: মুক্তা ইমেজ আকারেও উত্পাদন করা সম্ভব। কোনো মানুষ, প্রাণী বা বস্তুর ইমেজ আকারে মুক্তা উত্পাদন করা সম্ভব। মোম, ঝিনুকের খোলস, প্লাস্টিক, স্টিল ইত্যাদি পদার্থ দিয়ে ইমেজ তৈরি করা যেতে পারে। এজন্য ইমেজগুলোকে পানিতে ভেজাতে হবে। ঝিনুকের খোলস ৮-১০ মিমি খুলতে হবে এবং কাদা, বালি ইত্যদি পরিষ্কার করতে হবে। একটি পাতলা পাত দিয়ে খোলসের কিছু অংশ থেকে ম্যান্টল আলাদা করতে হবে। সাবধানতার সঙ্গে ইমেজ ঢুকিয়ে ম্যান্টল গর্ত থেকে বাতাস ও পানি বের করে দিতে হবে। বাংলাদেশে মুক্তা চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ বাংলাদেশে রয়েছে মুক্তা চাষ উপযোগী আবহাওয়া। মুক্তা উত্পাদনের জন্য প্রয়োজন উষ্ণ আবহাওয়া। আমাদের দেশে প্রায় ১০ মাসই উষ্ণ আবহাওয়া থাকে যা মুক্তা চাষের জন্য উপযোগী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে জাপান, চীন, ভারত প্রণোদিত উপায়ে মুক্তা চাষ করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। আমাদের দেশে উত্পাদিত মুক্তার বেশ চাহিদা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে মুক্তার চাহিদা থাকায় আমাদের দেশে মুক্তার উত্পাদন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক হিসেবে ১০ শতাংশের একটি পুকুরে মুক্তা চাষে মোট ব্যয় হবে ২৩ হাজার ৬২৪ টাকা। আয় হবে ৬৫ হাজার টাকা। খরচ বাদে মুনাফা হবে ৪১ হাজার ৩৭৬ টাকা। আমাদের দেশে মুক্তা উত্পাদনকারী পাঁচ প্রজাতির মিঠা পানির ঝিনুকের মধ্যে দুই প্রজাতির ঝিনুক ইমেজ মুক্তা উত্পাদনে অধিকতর উপযোগী। কৃত্রিম মুক্তা চাষ তেমন ব্যয়বহুল নয়। এ ছাড়া মাছের চাষের সঙ্গে সম্পূরক খাবারের প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের দেশে বিশাল জলাভূমি,পুকুর রয়েছে। যেখানে অতি সহজে মুক্তার চাষ করা সম্ভব। সম্ভাবনাময় এই শিল্পটিকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একটু তত্পর হবেন বলে আশা রাখি। দেশে মুক্তা উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনা সম্ভব।