সাড়ে নয় হাজার মাইল দূর থেকে মালির জনপ্রিয় শিল্পী হাবিব কোইটে ও তার ব্যান্ড বাংলাদেশের দর্শককে শোনালেন স্প্যানিশ ফ্ল্যামেনকো আর আফ্রো আমেরিকান ব্লুজের মূর্ছনা। আফ্রিকার মানুষের, মাটির সোঁদা গন্ধ তার গানে। আফ্রিকান পারকাশান, ফ্যামেনকো আর ব্লুজ—এই তিন ঘরানার মিশেলে সাহারা মরুভূমির লু হাওয়ার এক অপার্থিব সুরের দোলা ছুঁয়ে গেল ঢাকার শ্রোতা-দর্শকের হূদয়। পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী হিনা নাসরুল্লাহ শোনালেন সুফি ঘরানার গান। আল্লাহ ও তার রাসুলের বন্দনা ছিল তার গানের সুরে সুরে। বাংলাদেশের তরুণ শিল্পী রাব্বি ও শফিকুলের সঙ্গে কাজল দেওয়ান ও ফকির শাহাবুদ্দিনের বাউল গান মন মাতালো শ্রোতা-দর্শকদের। পৃথিবীর নানা প্রান্তের বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশনার মাঝেও একটি ঐক্যই ফুটে উঠছিল। তা হলো— দেশ, সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকলেও মানুষের হাসি-কান্নার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য নেই ভালোবাসা প্রকাশে, বিরহে ও স্বপ্ন বোনায়। বিভিন্ন দেশের শিল্পীর পরিবেশনায় মাটিঘনিষ্ঠ মানুষের কষ্ট, বঞ্চনা ও ভালোবাসার কথাই ফুটে উঠলো।
গতকাল মেরিল নিবেদিত ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক ফোক ফেস্ট’-এ দ্বিতীয় দিন মানুষের ঢল নেমেছিল। কানায়-কানায় ভরে গিয়েছিল স্টেডিয়াম। উত্সব মাতাতে দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই মঞ্চে ওঠে বাউলিয়ানার শিল্পীরা। নবীন শিল্পীদের মনমাতানো সুরে মাতে উপস্থিত প্রতিটি দর্শক। মঞ্চে ওঠেন একে একে কামরুজ্জামান রাব্বি, শফিকুল ইসলাম ও কাজল দেওয়ান। প্রথমেই শফিকুল গান নিয়ে আসেন। তিনি শুরুতেই পরিবেশন করেন ‘মন মজালে ওরে বাউলা গান’। এরপর গেয়ে শোনান ‘তুমি কই গেলা বন্ধু রে আমারে ছাড়িয়া’। কামরুজ্জামান বাবু একে একে গেয়ে শোনান ‘আল্লাহ রাসুল বিরাজ করে’, ‘তোমার সঙ্গে কিসের পিরিতি’, ‘আমি তো ভালা না, ভালা লইয়াই থাইকো’, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’সহ বেশ কিছু গান।
কাজল দেওয়ান মঞ্চে এসেই ধরেন ‘আমার মন পাগলা দিন ফুরাইলেই ভাইঙ্গা যাইব এ রঙের মেলা’। ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের এ বাউলশিল্পীর রয়েছে তিন শয়েরও বেশি অ্যালবাম। তিনি আরো গেয়ে শোনান ‘পিরিতের বাজার ভালো না’, ‘আমি তো পিরিতের দেওয়ানা’, ‘আরে ও জীবন রে’ ‘আজ আমার মন ভালা না’, ‘ও বাঁশি সুর দিয়া’সহ বেশকিছু গান।
এরপরে মঞ্চে আসে আফ্রিকা মহাদেশের মালিয়ান লোকসংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি হাবিব কোইটে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তার প্রথম অ্যালবাম ‘মুসো কো’ দিয়ে বিশ্বব্যাপী সংগীতপ্রেমীদের নজর কাড়েন তিনি। দুই যুগের বেশি সময় ধরে অনন্য গিটারবাদন দিয়ে শ্রোতাদের মজিয়ে রেখেছেন তিনি। এ পর্যন্ত বিশ্বের ১ হাজার ৭০০ কনসার্টে গান করেছেন তিনি। কাল আফ্রো-আমেরিকান সুরে মাতালেন বাংলাদেশের শ্রোতা-দর্শকদের।
হাবিব কোইটের পরে আসেন বাংলাদেশের বাউল ও সুফি গানের জনপ্রিয় শিল্পী ফকির শাহাবুদ্দিন। তিনি গেয়ে শোনান বাউল ও সুফি ঘরানার বেশকিছু গান।
সবশেষে মঞ্চে ওঠেন উপমহাদেশের জনপ্রিয় সুফি ঘরানার শিল্পী পাকিস্তানের হিনা নাসরুল্লাহ। ছোটোবেলায় হামদ-নাত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে যিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনিই পরে হয়ে ওঠেন সুফি ঘরানার কিংবদন্তিতুল্য শিল্পী। উর্দুর পাশাপাশি সিন্ধি ও সারাইকি ভাষাতেও গান করেন এ শিল্পী। কাল ফোক ফেস্টের মঞ্চেও শোনালেন বেশকিছু গান।