রাজু আহমেদ সবকিছুতেই অফিস প্রধান আফজাল স্যারের দোহাই দেন। স্যার কিছু বলুক আর না বলুক, তিনি কথা শুরু করেন ‘স্যার বলেছেন’ রেফারেন্স দিয়ে। যে কারণে কারো কিছু বলার থাকে না। তাছাড়া সব কথা তো আর স্যারকে জিজ্ঞাসা করা যায় না। সেদিনও কোনো কারণ ছাড়া শাহেদের রুমের পাশের টয়লেটের দরজায় তালা লাগিয়ে দিলেন রাজু।
শাহেদ ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, ‘রাজু ভাই, এটা কী করলেন? টয়লেটের দরজায় তালা দিলেন কেন?’
‘স্যার বলেছেন তালা লাগাতে,’ রাজুর সেই চিরচেনা উত্তর।
‘এটা কোনো কথা হলো। অফিস করব এখানে, আর টয়লেট করতে কি বাসায় যাব?’
‘স্যার বলেছেন, টয়লেটের দরজা খোলা থাকলে অপব্যবহার হয়। প্রয়োজন না হলেও অনেকে বারবার টয়লেটে যায়। আবার কেউ কেউ কমোডে বসে আরামে মেসেঞ্জারে চ্যাট করে। কয়েকজন নাকি ইউটিউবেও বসে আজেবাজে জিনিসপত্র দেখে। এতে অফিসের কাজের ক্ষতি হয়। তাই স্যার বলেছেন তালা লাগাতে।’
‘বাহ্। খুব ভালো সিদ্ধান্ত। স্যার যেহেতু বলেছেন কী আর করা। আমাদেরও নিজের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তালা লাগানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। না হলে তো টয়লেটের বেগ পেলেই দৌড়াতে হবে। আপনার স্যারকে বলে দেখেন তো এমন কোনো তালা পাওয়া যায় কিনা।’
রাজুকে নিয়ে মশকরা করা হচ্ছে বুঝতে পেরে তিনি বললেন, ‘আমি যাই ভাই। স্যার বলেছেন অযথা কথা বলে সময় নষ্ট করা যাবে না।’
দুই.
‘ভাই চায়ের মধ্যে পানি মিশিয়ে খাচ্ছেন কেন?’ রাজুর কাছে জানতে চাইলেন শাহেদ।
‘স্যার বলেছেন গরম চা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আপনাকে দেব জল চা?’
‘জি না। আপনিই আদেশ পালন করেন স্যারের।’
‘আপনি স্যারকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছেন। আমি কিন্তু স্যারকে বলে দেব।’
‘আহা রাগ করছেন কেন? চলেন আমার রুমে। কথা আছে।’
‘ঠিক আছে চলেন।’
‘বলেন কী এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা,’ শাহেদের রুমে গিয়ে জানতে চাইলেন রাজু।
‘একটু বসেন। আমি আসছি,’ এই বলে শাহেদ টি বয়ের রুমে গেলেন। তারপর এক মগ চা নিয়ে হাজির হলেন।
‘স্যার আমাকে সকালে বলেছেন কেউ যেন আমার রুম থেকে চা না খেয়ে বের হয়। নেন চা।’ এই বলে রাজুর দিকে চায়ের মগ এগিয়ে দিলেন সাহেদ।
রাজু কিছুটা বিব্রত হয়ে চায়ে চুমুক দিয়েই আঁতকে উঠলেন! এত ঠান্ডা কেন? মনে হচ্ছে চায়ের মধ্যে বরফ এবং তেল জাতীয় কিছু দেওয়া আছে।
‘স্যার বলেছেন কলিগদের চায়ে বরফ আর তেল মিশিয়ে দিতে। বরফ মাথা ঠান্ডা রাখার কাজ করবে। আর তেল পেটে গেলে তেলবাজিতে সুবিধা হবে।’
‘শাহেদ ভাই আপনি রুমে এনে আমাকে অপমানিত করছেন।’
‘আপনাকে অপমান করার মতো দুঃসাহস আমার নেই। স্যার বলেছেন বলেই তো দিলাম।’
রাজু রেগে শাহেদের রুম থেকে বের হয়ে গেলেন।
তিন.
অফিস পরিদর্শন করতে হেড অফিস থেকে একটা বিশেষ টিম আসবেন। অফিসপ্রধান আফজাল স্যার সবাইকে ডেকে বললেন সারারাত কাজ করতে হবে। বিশ্রামের জন্য অফিসের একটি কক্ষও বরাদ্দ দেওয়া হলো। রাতভর পরিশ্রমের পর সেই কক্ষে গিয়ে বিশ্রাম নিলেন রাজু ও শাহেদ।
কাক ডাকা ভোরে আফজাল সাহেব এসে বললেন, ‘রাজু আমি স্যারকে রিসিভ করতে যাচ্ছি। আপনি আমার অনুমতি ছাড়া কিছুই করবেন না। আমাকে না বলে কেউ যাতে কোনোদিকে না যায় সেদিকেও খেয়াল রাখবেন।’
রাজু গদগদ হয়ে বললেন, ‘জি স্যার।’
আফজাল চলে যাওয়ার পর শাহেদ বললেন, ‘রাজু ভাই, আপনি বসেন। আমি নিচতলার থেকে টয়লেট সেরে আসি।’
‘স্যার কিন্তু কোথাও যেতে মানা করেছেন। তারপরও যদি যেতেই হয় আগে স্যারকে একটা ফোন দেন প্লিজ,’ বললেন রাজু।
‘টয়লেটে গেলেও স্যারের অনুমতি লাগবে নাকি?’
‘স্যার বলেছেন...’
‘ধুর মিয়া, রাখে আপনার স্যার স্যার!’ এই বলে শাহেদ টয়লেট করতে চলে গেলেন।
শাহদে রুমে ফিরে দেখেন রাজু কেমন কাচুমাচু করছেন।
‘ভাই, কিছু হয়েছে নাকি?’ জানতে চাইলেন শাহেদ।
‘না তেমন কিছু না। বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল।’
‘এটা নিয়ে বসে থাকার কী আছে। যান সেরে আসেন।’
‘কিন্তু স্যারের কাছ থেকে তো অনুমতি নেওয়া হয়নি।’
শাহেদ বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ধুর মিয়া! সব কাজে স্যারকে টানেন কেন?’
‘ভাই, আমি স্যারের কথার বাইরে কিছু করতে চাই না।
‘তাহলে ফোন দেন স্যারকে।’
‘কয়েকবার দিয়েছি। স্যার ধরেছেন না।’
‘তাহলে চেপে বসে থাকেন। স্যারের অনুমতি মিললে তখন যাবেন,’ শাহেদ বললেন।
ভাই আর পারছি না।’ এই বলে মোচড়ামুচড়ি শুরু করলেন রাজু।
‘একটু অপেক্ষা করেন। আমি স্যারকে ফোন দিচ্ছি,’ বলে নাম্বার ডায়েল করলেন শাহেদ।
ঠিক তখনি রাজু বললেন, ‘ভাই, স্যারকে ফোন দিতে হবে না।’
‘আবার কী হলো?’
‘যা হবার হয়ে গেছে। আপনি বরং পরিচ্ছন্ন কর্মী শিবেনকে কল দেন। না হয় দুর্গন্ধ ছড়াবে।’