ইত্তেফাক রিপোর্ট
পেঁয়াজ-সংকটের অজুহাতে ভোক্তাকে জিম্মি করে মাত্রাতিরিক্ত উচ্চদামে পেঁয়াজ বিক্রি করে ব্যবসায়ীদের মুনাফা লোটার ঘটনায় সরব আলোচনা এখন সর্বত্র। খুচরা পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ২৫০ টাকায় উঠে যাওয়ার পর প্রশ্ন এসেছে—এসব পেঁয়াজের আমদানিমূল্য কত ছিল? জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক বিভাগসূত্র জানিয়েছে, গত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আমদানিকৃত প্রতি কেজি পেঁয়াজের গড়দাম ছিল ৩০ টাকা ৩৬ পয়সা। আর আমদানি পর্যায়ে দর বেড়ে যাওয়ার পর কেবল অক্টোবরে আমদানিকৃত পেঁয়াজের দাম পড়েছে কেজিপ্রতি ৭৪ টাকার সামান্য বেশি। আমদানিকারকরা যে মূল্য ঘোষণা দিয়েছেন, তার ভিত্তিতে হিসাব করে এ তথ্য জানিয়েছেন শুল্ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অথচ পেঁয়াজ-সংকটের দোহাই দিয়ে ভোক্তাকে জিম্মি করে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকার ওপরে।
সূত্র জানিয়েছে, গত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে দেশে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার মেট্রিক টন। এর বেশির ভাগই এসেছে প্রতিবেশি ভারত থেকে। আলোচ্য সময়ে ভারত থেকেই এসেছে ২ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন। আমদানিকারকদের ঘোষিত মূল্য অনুযায়ী ২ লাখ ৫০ হাজার টন পেঁয়াজের দর পড়েছে ৭৫৮ কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দর পড়েছে গড়ে ৩০ টাকার সামান্য বেশি। এছাড়া অক্টোবরে খুব বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি হয়নি। ঐ সময়ের আমদানি হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম পড়েছে গড়ে ৭৫ টাকার কম।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী পেঁয়াজের যোগানে কিছুটা ঘাটতি দেওয়া দাম বাড়তির দিকে; কিন্তু বাংলাদেশে যে দাম দেখা গেছে, তা রীতিমতো অস্বাভাবিক। সরবরাহ কম থাকার সুযোগে দৈনন্দিন চাহিদার এ পণ্যটির দাম সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে রীতিমতো আকাশ ছুঁয়েছে। যথাযথ তদারকির অভাবও এর পেছনে দায়ী। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শেষ পর্যন্ত কার্গো বিমানে পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বছরে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৫ থেকে ২৬ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে দেশের উত্পাদন বাদ দিয়ে ঘাটতি ১০ থেকে ১২ লাখ মেট্রিক টন। এই পেঁয়াজের বড়ো অংশই আসত প্রতিবেশি ভারত থেকে। এবার ভারতে বন্যার কারণে সেখানেও পেঁয়াজের সংকট দেখা দেয়। বেড়ে যায় দাম। এক পর্যায়ে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরই দেশে হু হু করে বেড়ে যেতে থাকে পেঁয়াজের দাম।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পুরো পরিস্থিতিতে ক্রেতার মধ্যে এক ধরনের ‘প্যানিক’ সৃষ্টি হয়েছিল। চাহিদা ও যোগানের এ ব্যবধানের সুযোগে ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ক্ষেত্রবিশেষে আমদানিমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করা হয়। তবে দামের কারসাজির পেছনে খুচরা ব্যবসায়ীদের চেয়ে আমদানিকারক ও পাইকাররাই ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে এসেছে ১ লাখ ৭৩ হাজার মেট্রিক টন। এসব পেঁয়াজের দর পড়েছে কেজিপ্রতি প্রায় ৪৩ টাকা। এছাড়া কেবল অক্টোবরে দেশটি থেকে এসেছে ১৩ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ।