বাংলাদেশে চীনের অবকাঠামোগত ঋণ জৌলুস হারাচ্ছে

বিপুল ও ব্যয়বহুল অকাঠামোগত প্রকল্প  বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার এখন বিকল্প উত্স থেকে তহবিল সংগ্রহের কথা চিন্তাভাবনা করছে। কেননা ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফর করে যে ঋণদানের কথা বলেছিলেন, তা শিগিগর আসছে না। যদিও চীনা প্রেসিডেন্ট বড়ো প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের ২৭টি বড়ো প্রকল্পে ঋণদানের জন্য একটি সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, তথাপি এসব প্রতিশ্রুতি ‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’ অবস্থার মতো কেবল ফাইলপত্রেই আছে। বাস্তবে নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রতিশ্রুতির খুব সামান্য অর্থই এসেছে। বাংলাদেশের যেসব বড়ো প্রকল্পে চীনের ঋণপ্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা হলো : পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প (২৬৬৭.৯৪ ডলার), পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ প্রকল্প (৯৭০.০২ মিলিয়ন ডলার), ডিজিটাল কানেকটিভিটি স্থাপন (৮৩৭ মিলিয়ন ডলার), জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ডাবল লাইন স্থাপন (১০৪৫.৫৯ মিলিয়ন ডলার), সিতাকুন্ডু-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ও উপকূলীয় এলাকা রক্ষণাবেক্ষণ (২৮৫৬.৫৬ মিলিয়ন ডলার), আখাউড়া-সিলেটে মিটার গেজের স্থলে ব্রডগেজের রেললাইন স্থাপন (১২৭২.৯৩ মিলিয়ন ডলার) ইত্যাদি।

২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যখন বাংলাদেশ সফর করেন, তখন তিনি ‘স্ট্রেংদেনিং অ্যান্ড প্রডাকশন ক্যাপাসিটি কো-অপারেশন’ নামে একটি সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এতে ২৭টি বিনিয়োগ প্রকল্পে মোট ২০ বিলিয়ন ইউএস ডলার ঋণপ্রদানের কথা বলা হয়, যা ২০১৬-২০২০ সালের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে। এই ২৭টি প্রকল্পের মধ্যে মাত্র পাঁচটি প্রকল্পে ঋণদানের জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো হলো— পদ্মা ব্রিজ রেল সংযোগ প্রকল্প, সিঙ্গেল পয়েন্ট টার্মিনাল নির্মাণ, কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণ এবং ইনফো সরকার-৩ ও টেলিকমিনিউকেশন নেটওয়ার্কের আধুনিকীকরণ। কিন্তু এ পর্যন্ত যে অর্থ এসেছে তা প্রতিশ্রুত অর্থের পাঁচ ভাগেরও কম। চীনা যন্ত্রপাতি ও জনবল নেওয়ার জন্য স্থানীয় অংশীদারদের ওপর চাপ দিতে চীনারা বেশ পটু ও ওস্তাদ। চীনের জিটিই করপোরেশন টেলিকমিনিউকেশন নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণ প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্প্রতি অতিরিক্ত সুইচবোর্ড কেনার কথা বলেছে। অথচ এই সুইচবোর্ডগুলো নিম্নমানের ও অব্যবহারযোগ্য। চীনের অর্থায়নে পরিচালিত কোনো প্রকল্পে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ও মূল্যবৃদ্ধির ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে। চীনাদের এই চর্চা নতুন নয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশে চীনা অবকাঠামো সহায়তা গতিশীল করার জন্য চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের (ইকোনমিক রিলেশনস ডিপার্টমেন্ট-ইআরডি) প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। এই জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ ২৭টি প্রকল্পে চীনা প্রেসিডেন্টে শি জিনপিং প্রতিশ্রুত ২০ বিলিয়ন ডলার অর্থপ্রবাহে কেন বিলম্ব হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখবে। গত জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফর করেন। এই সময় দুই পক্ষ একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠনে চুক্তিতে উপনীত হয়। এই কমিটি অর্থ ছাড়ের বিলম্বের কারণগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করবে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইআরডি কর্মকর্তা বলেছেন, যদি চীনারা সম্মত না হয় বা প্রজেক্ট ডকুমেন্টের সামান্য একটি অর্থও বুঝতে না পারে, তাহলে তারা সবকিছু নতুন করে শুরু করার জন্য বাংলাদেশে ফাইল পাঠিয়ে দেয়। তাছাড়া চীনের এক্সিম ব্যাংকের কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ব্যাংকের মাত্র কয়েকজন কর্মকর্তা বিদেশি ঋণের বিষয়টি দেখে থাকেন। আবার চীনা ফার্মগুলো কন্ট্রাক্ট পেতে লেগে থাকে, অনেক সময় তাদের কারণেও বিলম্ব হয়। অর্থ ছাড়েও কালক্ষেপণ করা হয়।

পাঁচটি প্রকল্পে স্বাক্ষরিত ঋণচুক্তির অর্থের পরিমাণ ৪.২৬ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬ সালের অক্টোবর ও গত বছরের এপ্রিলের মধ্যে চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়েছে।  কিন্তু অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে খুব কমই। কর্ণফুলী রিভার টানেল প্রজেক্টে ৬৮৯.৩৫ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে ২০১৬ সালের অক্টোবরে। কিন্তু অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৯৪.৮১ মিলিয়ন ডলার। ২০১৭ সালের নভেম্বরে সিঙ্গেল পয়েন্ট টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ৫৫০.৬৭ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, কিন্তু এই প্রকল্পে অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে মাত্র ৮২.৭৩ ডলার। গত বছর এপ্রিলে টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণের জন্য ২২৪.৯৬ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪৪.৯৪ ডলার। একই মাসে পদ্মা ব্রিজে রেল প্রকল্পের জন্য ২.৬৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এ পর্যন্ত অর্থ এসেছে মাত্র ৫৩৩.৫৮ মিলিয়ন ডলার। তবে ইনফো সরকার প্রকল্পে তুলনামূলকভাবে বেশি অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে। এই সংক্রান্ত চুক্তিটি ২০১৭ সালের অক্টোবরে স্বাক্ষরিত হয় এবং ১৫১.৬৪ মিলিয়নের মধ্যে এ পর্যন্ত অর্থ এসেছে ১২৫.৫০ মিলিয়ন ডলার। আরেকটি বিষয় হলো, অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে চীনের যে ঋণ দেওয়া হচ্ছে তার সুদের হার বেশি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী ২০ বছরের জন্য চীনের রেয়াতি ঋণের বার্ষিক সুদহার ২ শতাংশ। অথচ এর বিপরীতে জাপান ও ভারতের ঋণের সুদহার ১ শতাংশ। এ বছর জুলাই মাসে চীন সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে এক বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, তার সুদহারও ২ শতাংশ।

হার্ভাড ইউনিভার্সিটির কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টের প্রফেসর কারমেন রেইনহার্ট ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত নোমুরা ইনভেস্টমেন্ট ফোরামের বক্তৃতায় বলেন, ‘বৈশ্বিক ঋণদাতা হিসেবে চীনের উত্থানের অর্থ হলো লুক্কায়িত ঋণের পরিমাণও বৃদ্ধি পাওয়া। এমন অনেক দেশ চীন থেকে ঋণ নিয়েছে, যা আইএমএফ বা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কোনো রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়নি। এসব দেশ হলো—শ্রীলঙ্কা, ইউক্রেন, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর, বাংলাদেশ ও কিউবা। তাছাড়া চীন বিভিন্ন দেশে অফিশিয়াল ঋণপ্রদানকারী প্যারিস ক্লাবের সদস্য নয় এবং তাতে যোগদানে আগ্রহীও নয়। এই অস্বচ্ছ ঋণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস।

এই অস্বচ্ছ ঋণ পরিস্থিতি সমস্যার সৃষ্টি করবে বলে মনে করেন এশিয়া বিশ্লেষক কাহু ইউ। তার মতে, ‘বেইজিং প্রদত্ত ঋণ উন্নয়নশীল দেশকে সাহায্য করতে পারে, তবে অস্বচ্ছ ঋণ এমনকি সেসব দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে হ্রাস করতে পারে।’ সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি এ কথা বলেন। মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপে চীনের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি ৪৪০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থসহায়তা প্রদান করেছে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রজেক্ট’কে সামনে রেখে। চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়নার মাধ্যমে এই অর্থ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু এসব ঋণের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। প্রকল্পের প্রাথমিক অবস্থায় এইসব ঋণ থেকে লাভবান হতে পারে যে কোনো দেশ, তবে দীর্ঘ মেয়াদে তার ঘাটতি বাড়তেই থাকে। তার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হলো শ্রীলঙ্কা। চীনা কোম্পানির ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়ে ২০১৭ সালে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর তাদের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়েছে।

চীনের ঋণের ঝুঁকি বাড়ছে। কেননা চীনের অর্থনীতিতে এখন বিরাজ করছে মন্দা ভাব। ফলে বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রজেক্টে অর্থদান হ্রাস পাচ্ছে। অন্য দেশে চীনের ঋণদানও কমে আসছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধের পর থেকে চীনের অর্থনৈতিক গতি এখন শ্লথ। এমনকি ২৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিম্নগতি বিরাজমান। ২০১৯ সালের প্রথম তিন মাসে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তির দেশ চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬.৪ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৬.২ শতাংশ।

বাংলাদেশ সিপেকের (চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর) ব্যর্থতা থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করছে। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সময় সিপেকের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে পাকিস্তান চীন থেকে ৬২ বিলিয়ন ডলার ঋণ গ্রহণ করে। পাকিস্তানের শিল্পায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুত্ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও গুয়াদার বন্দরসহ কয়েকটি বন্দরের উন্নয়নের জন্য এই ঋণ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু পাকিস্তানের বর্তমান ইমরান খানের সরকার সিপেক নিয়ে সমালোচনা করছেন। কেননা গত অর্থবছরে যেখানে সিপেক থেকে ১.২০ বিলিয়নের জোগান এসেছিল, সেখানে বর্তমান অর্থবছরে এসেছে মাত্র ৫০৫.৪২ মিলিয়ন ডলার। ফলে নিউ গুয়াদার ইন্টারন্যাশনাল ইয়ারপোর্ট প্রজেক্টে দুই-তৃতীয়াংশ বরাদ্দ কমানো হয়েছে। গুয়াদারের মানুষ বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের সমস্যায় পড়েছেন। দিনের ১৬ ঘণ্টাই বিদ্যুত্ থাকে না। পাকিস্তানের ১ মিলিয়ন মানুষ চাকরি হারানো ও ৮ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমায় উপনীত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষের মতামত হলো—সিপেক পাকিস্তানের অর্থনীতিকে হত্যা করছে। চীন সিপেকের অধীন গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করে দেবে বলে খবর বেরিয়েছে। ঋণফাঁদের ভয় থেকেও চীনের ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ এখন শিক্ষা গ্রহণ করছে। বাংলাদেশ বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা হাইওয়ে প্রকল্প গ্রহণের জন্য চীনকে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু সেই অনুরোধ এখন ডিপফ্রিজে চলে গেছে। চীনা পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা বাংলাদেশে অবকাঠামোগত প্রকল্প সম্প্রসারণের ব্যাপারে আর আগ্রহী নয়। বাংলাদেশের ভয় হলো ২৭টি প্রকল্পের বাস্তবায়ন এখন কীভাবে হবে? ইআরডির একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, যদি চীনা অর্থনীতির আরো পতন হয়, তাহলে বর্তমান চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যত্ নিয়েই সন্দেহ ও শঙ্কা দেখা দেবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে এসব প্রজেক্ট সম্পন্নের জন্য বাংলাদেশকে অন্য উেসর সন্ধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে হয় নিজের সম্পদের ওপর নির্ভর করতে হবে অথবা অন্য কোনো বিকল্প উত্স থেকে তহবিল সংগ্রহ করতে হবে।

ইংরেজি থেকে অনু্বাদ : ফাইজুল ইসলাম

n লেখক : ইত্তেফাকের নয়াদিল্লি প্রতিনিধি