মেঠো পথে মাতৃভূমি দর্শন

দুর্গাপুরের বিজয়পুরের চীনামাটির পাহাড়ে যাই পরদিন। এছাড়া সোমেশ্বরী নদীর অপরূপ ঐশ্বর্য আমাদের চোখ এড়াতে পারেনি

  নাজমুল মৃধা

 

আমাদের বন্ধুত্ব চার বছর শেষ হয়ে পাঁচ বছরে পদার্পণ করেছে। ৯ জনের বন্ধুত্বে চার বছরে এতটুকু চির ধরাতে পারেনি। বন্ধুত্ব সজীব করে রাখতে আমরা প্রায় সময় দেশের বিভিন্ন জেলায় ভ্রমণে বের হই। এবার যেমন দেশের দুটি সীমান্তবর্তী জেলা নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ ভ্রমণ করে এলাম। ৬ তারিখ রাত সাড়ে ১০টায় রাজশাহী থেকে ময়মনসিংহগামী শামীম পরিবহনের একটি বাসে চড়ে আমরা ময়মনসিংহে যাই। সেখান থেকেই শুরু আমাদের অ্যাডভেঞ্চার। পরে ময়মনসিংহ ব্রিজ থেকে রিজার্ভ সিএনজি অটোরিকশায় করে রওনা হই নেত্রকোনা জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা কলমাকান্দায় আমাদের গ্রামের পথে। আমার জন্ম মেঘালয়ঘেষা বাঘবেড় গ্রামে হলেও গ্রামের সৌন্দর্য এতটা এর আগে উপভোগ করা হয়নি কোনো দিন। এবার যেন বাকি বন্ধুদের মতো আমার চোখেও সৌন্দর্য দেবী ভর করেছিল।

৭ তারিখ সকালে সিএনজি অটোরিকশা দিয়ে আমাদের বাড়িতে পৌঁছাই। হেমন্তের অপরূপ রূপে গ্রাম সেজেছে নতুন বৌয়ের সাজে! নেত্রকোনা জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে কলমাকান্দায় আমার গ্রাম। মাঠে সোনালি ধান আর মেঘালয় পাহাড়ের মিতালি গ্রামটিকে করে তুলেছে একখণ্ড সবুজের বুকে এক টুকরো সোনার খনি। সকাল ৯টায় যখন আমরা গ্রামে পৌঁছাই, তখনো হেমন্তের শিশির বিদায় নেয়নি। হালকা শীতের আগমন আমাদের ক্লান্ত দেহে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিয়ে গ্রামটি যেন আমাদের গ্রহণ করেছে। দূরের দুর্গম রাস্তা আর ভাঙাচোরা মেঠোপথ পার হয়েই আমাদের বাড়িতে পৌঁছাতে হয়। সেজন্য বন্ধুরা আমার ওপর খুব রেগে গিয়ে বলেই ফেলেছিল—আমি নাকি তাদের শাস্তি দিচ্ছিলাম! এত দূর থেকে কেউ পড়তে যায়? পরে অবশ্য পাহাড়ি এলাকা আর গ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখে আমায় ওরা বুকে টেনে নিয়েছিল।

দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়ে আমরা বাড়ির সামনে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ের কাছে ঘুরতে যাই। আমার বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিট ধানখেত ধরে উত্তর দিকে হাঁটলেই ভারতের মেঘালয় রাজ্য। মেঘালয় পাহাড়ের বিশালতা বন্ধুদের ক্লান্তি দূর করে ওদের খানিক সময়ের জন্য ভাবুক করে তুলেছিল। সারা দিন গ্রাম আর পাহাড়ি এলাকা ঘুরে আমরা গ্রামের বাজারে যাই রাতে। আমাদের ৯ জনের মধ্যে তিন জন প্রমিলা সদস্যও ছিল। পরদিন সকালে আমার নানাবাড়িতে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া আর গানের আড্ডা দিয়ে বিকেলে চলে যাই সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার ভারতের সীমান্তঘেষা এলাকা মহিষখোলা গ্রামে। বলা ভালো, আমাদের গ্রাম থেকে সুনামগঞ্জ জেলার সীমানা খুব দূরে নয়। আমাদের এই অঞ্চলটা এতটাই প্রত্যন্ত যে পুরোটাই মেঠো পথ, এখানে অটো ও সিএনজি চলতে পারে না। মহিষখোলায় যেতে আমাদের বাজার থেকে ভাড়ায় বাইক পাওয়া যায়। আমরা পাঁচটি বাইক নিয়ে মহিষখোলায় আমার খালার বাড়িতে চলে যাই। রাতভর সেখানে আড্ডা ও ঘুম দিয়ে পরদিন সকালে আমার খালাতো ভাইসহ পাঁচটি ভাড়া বাইক নিয়ে রওনা হই সুনামগঞ্জের দর্শনীয় স্থান নীলাদ্রি, বারাক্কা টিলা, যাদুকাটা নদী ও শিমুলবাগান দেখতে। আমার খালার বাড়ি থেকে পূর্ব দিকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ের নিচ দিয়ে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার রাস্তা বাইকে করে যেতে হয়। অল্প একটু রাস্তা পাকা হলেও ৩৫ কিলোমিটারের মতো রাস্তা কাঁচা। তার ওপর যেদিন আমরা ঘুরতে বের হই, সেদিন আবার ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ পুরো দেশে আঘাত হেনেছে।

মাথার ওপর বিষণ্ন আকাশ আর নিচে একহাঁটু কাদার রাজত্ব অবহেলা করে আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাই। মেঘালয় পাহাড় আর টাঙ্গুয়ার হাওরের অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতেই আমরা আমাদের গন্তব্যের দিকে যেতে থাকি। দিনভর ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজে পাহাড়-হাওরের মিতালিতে সমৃদ্ধ সুনামগঞ্জ জেলা শেষ করে আমরা রাতে বাড়ি ফিরি। তবে যাওয়ার সময় বাইকে চড়ে যেতে পারলেও আমাদের বাড়িতে ফেরত আসার সময় আর বাইকে চড়ার মতো অবস্থা ছিল না। কাদায় বাইকগুলো হয়ে গিয়েছিল ছন্নছাড়া। প্রায় রাস্তাতেই একহাঁটু কাদা ছিল। ‘বুলবুল’ ঘূর্ণিঝড় আমাদের ভ্রমণটাকে যেন কেড়ে নিতে চেয়েছিল, তবে আমাদের তারুণ্যের কাছে সে হার মানতে বাধ্য হয়।

সুনামগঞ্জ পর্ব শেষ করে আমরা আমাদের বাড়িতে চলে আসি। এর পরদিন আমাদের গন্তব্য নেত্রকোনা জেলার দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করা। আমরা জেলার সীমান্তবর্তী সমৃদ্ধ দুর্গাপুরের বিজয়পুরের চীনামাটির পাহাড়ে যাই পরদিন। এছাড়া সোমেশ্বরী নদীর অপরূপ ঐশ্বর্য আমাদের চোখ এড়াতে পারেনি। টন টন বালি, পাথর এই নদী থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে ড্রেজার মেশিন দিয়ে, যা আমাদের অর্থনীতিকে করছে শক্তিশালী।