স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর বীরাঙ্গনার খেতাব

  মীর আনোয়ার হোসেন টুটুল

 

দৈনিক ইত্তেফাকে পরপর দুইটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর অবশেষে বীরাঙ্গনার খেতাব পেলেন ববিজান বেগম (৫৮)। এ জন্য তিনি ইত্তেফাক কর্তৃপক্ষের নিকট চিরকৃজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় গত ২৯ জুলাই ববিজানসহ ৪৬ জনের বীরাঙ্গনার নামের তালিকার গেজেট প্রকাশ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। ১০ নভেম্বর রবিবার মির্জাপুর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, এখন থেকে বীরাঙ্গনা ববিজান বেগম মুক্তিযোদ্ধাদের মতোই মাসিক ভাতা ও সম্মানীসহ সরকারের প্রদত্ত সব ধরনের সুযোগ সুবিধা পাবেন। এ বিষয়য়ে সকল প্রকার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার ১৩ নম্বর বাঁশতৈল ইউনিয়নের বাঁশতৈল পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত আরাদন আলীর মেয়ে বৃদ্ধা ববিজান বেগম। দীর্ঘ ৪৮ বছর পর মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় বীরাঙ্গনা হিসেবে ববিজানের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তিনি মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রণালয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কর্মকর্তাদের কাছে কৃতজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

বীরাঙ্গনা নারী মির্জাপুরের ববিজান বেগম মাত্র ১৩ বছর বয়সে একই গ্রামের দবু খাঁর ছেলে দুদু খাঁর সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। তিনি সুন্দরী বাংলার সহজ-সরল গৃহবধূ। শুরু হয় স্বাধীনতাযুদ্ধ। এসময় তার বয়স ছিল ১৯ বছর। পাক বাহিনীর গণধর্ষণের মতো পাষবিক অত্যাচারে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে তারা চলে গেলে আশপাশের বাড়ির লোকজন তাকেসহ আরো কয়েকজনকে উদ্ধার করে চিকিত্সা দেন। এতে তিনি সুস্থ হলেও ধর্ষিতা হওয়ার অপরাধে তাকে স্বামীর সংসার ছাড়তে হয়। পরে সাত বছরের সংসার জীবনের এক বছরের শিশুকন্যা রহিমা আক্তারকে নিয়ে তাকে বাধ্য হয়ে বাবার বাড়ি চলে যেতে হয়। সেখানে সত্-মায়ের অভাবের সংসারে বেশি দিন ঠাঁই হয়নি ববিজান বেগমের। দেশ স্বাধীনের কিছুদিন পর ময়মনসিংহের আব্দুল মালেক নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। এরপর এক ছেলে রফিকুল ইসলামের জন্ম হয়। কিন্তু মালেকের আগের স্ত্রী-সন্তান থাকায় সেখানেও টিকতে পারেননি তিনি। ছেলে রফিকুলকে নিয়ে ফিরে আসেন বাবার বাড়ি বাঁশতৈল গ্রামে। বাবা আরাদন আলী মারা যাওয়ার পর সত্-মায়ের সংসারে ঠাঁই হয়নি তার। তিনি সরকারি একটু জমিতে ঘর তুলে ছেলে রফিকুল ও মেয়ে রহিমাকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। শিশু ছেলেমেয়ে নিয়ে ভিক্ষা করে খেয়ে না খেয়ে চলতে থাকে তার সংসার। তার এমন দুরবস্থা দেখে বাঁশতৈল গ্রামের বৃদ্ধ ইয়াদ আলী নিজেকে সেবাযত্ন করার জন্য ববিজানকে স্ত্রীর মর্যাদা দেন। ইয়াদ আলী মারা যাওয়ার পর অসহায়তার কারণে সরকারী বনাঞ্চলের রিজার্ভের একটি প্লট পান ববিজান বেগম। সেখানে ছেলেমেয়ে নিয়ে বসবাস করে আসছেন। কিন্তু তার সেই প্লট নিয়েও একই গ্রামের গফুর মিয়ার ছেলে নূরু মিয়াসহ আরো কয়েকজন মিলে নানাভাবে হয়রানি করে আসছে। হুমকি দেওয়া হচ্ছে তার ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হবে। বয়স হওয়ায় ববিজান এখন কানে কম শোনেন, স্মৃতিশক্তিও কমে গেছে। কাজ কাম করতে না পারায় ছেলের সংসারে খেয়ে না খেয়ে কাটছে। তবু বয়স্ক বা বিধবা ভাতা পাননি ববিজান। পাননি সরকারি সুযোগ-সুবিধাও।