একুশ দেশের নবীন ও প্রবীণ স্থপতিদের সম্মিলন

>> সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

 

বর্ণিল নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হলো স্থাপত্যবিষয়ক ফোরাম ‘আর্কএশিয়া ফোরাম-২০’। এশিয়ার ২১টি দেশের স্থপতিদের শীর্ষ সংগঠন দি আর্কিটেক্টস রিজিওনাল কাউন্সিল এশিয়ার (আর্কএশিয়া) পঞ্চাশবছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানমালার এবারের আয়োজক দেশ ছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের আয়োজনে আর্কএশিয়ার পঞ্চাশ বছরপূর্তি উদযাপনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘আর্কিটেকচার ইন অ্যা চেঞ্জিং ল্যান্ডস্কেপ’।

নির্মাণপণ্যের মেলা ও প্রদর্শনীর পাশাপাশি এই আয়োজনে সেমিনার, তরুণদের নিয়ে ইয়ুথ ফোরাম, বিদেশ থেকে আসা স্থপতিদের নিয়ে হেরিটেজ ওয়াক, কৃতি স্থপতি ও স্থাপত্যের শিক্ষার্থীদের পুরস্কার প্রদান, সাংস্কৃতিক আয়োজন, ফ্রেন্ডশিপ নাইটসহ নানা আয়োজন চলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট, পানাম নগর, হাতিরঝিলের মুক্তমঞ্চসহ অন্যান্য স্থানে। বাংলাদেশসহ ২১টি দেশ থেকে আসা প্রায় দেড় হাজার স্থপতি এই আয়োজনকে ঘিরে একত্রিত হন। গত ৩১ অক্টোবর মানিক মিয়া এভিনিউ ও গুলশানের শহীদ তাজউদ্দীন স্মৃতিপার্কে শুরু হয় ‘আর্কিটেকচার অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রদর্শনী। জাহাজ বা রেলগাড়ি-মালগাড়িতে যেমন বড়ো কন্টেইনার চোখে পড়ে, তেমনই কন্টেইনার সাজিয়ে রাখা হয়েছিল সংসদ ভবনের সামনের রাস্তায়। কন্টেইনারের গায়ে দেশের বিখ্যাত নানা স্থাপনা ও ঘরবাড়ির ছবি আঁকেন একদল শিক্ষার্থী, যেন এক দেয়ালে পুরো দেশকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা। কন্টেইনারের ভেতরে চলে চিত্রপ্রদর্শনী। মূলত উত্সবের আমেজে স্থাপত্য পেশা ও শিল্পকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই শহরের বিভিন্ন জায়গায় উন্মুক্ত প্রদর্শনী চলে। এছাড়াও ঢাকা শহরের বেশকিছু জায়গায় আর্কএশিয়ার সুবর্ণজয়ন্তী উত্সবকে আরো বর্ণিল করতে শিক্ষার্থীদের তৈরি বিভিন্ন ‘ইনস্টলেশন প্রজেক্ট’ স্থাপন করা হয়। আর্কএশিয়ার পুরো আয়োজনে স্বনামধন্য ও অভিজ্ঞ স্থপতিদের সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও কাজের সুযোগ পেয়েছেন। তরুণদের অংশগ্রহণে পুরো আয়োজনকে আরো প্রাণোচ্ছল করে তোলাই ছিল আয়োজকদের লক্ষ্য। ১১টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী কাজ করেছেন।

৩ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আর্কএশিয়া ফোরামের উদ্বোধন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন আর্কএশিয়া ফোরাম ২০-এর আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ড. আবু সাঈদ। এছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট জালাল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক নওয়াজিশ মাহবুব, সাবেক প্রেসিডেন্ট কাজী গোলাম নাসির, ভাইস প্রেসিডেন্ট (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) মো. এহসান খান, ভাইস প্রেসিডেন্ট (জাতীয় সম্পর্ক) মামুন মোরশেদ চৌধুরী, আর্কএশিয়া ফোরাম ২০-এর আয়োজক কমিটির উপদেষ্টা মোবাশ্বের হোসেন ও আর্কএশিয়ার সদ্যসাবেক প্রেসিডেন্ট রিটা সোহ।

বাংলাদেশিসহ আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত ১৪ জন খ্যাতিমান স্থপতি ফোরাম ও সেমিনারে তাদের প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অন্য অতিথিরা।

বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে একইদিনে শুরু হয় আইএবি বিল্ড এক্সপো। এই নির্মাণ মেলায় ৭৮টি স্টলে ২১ দেশের নির্মাণ সামগ্রী উত্পাদন, আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী বৃহত্ প্রতিষ্ঠানগুলো অংশগ্রহণ করে। পাশাপাশি একইস্থানে চলে আর্কএশিয়া ও আগা খান স্থাপত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত ডিজাইন ও স্থাপত্যবিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। ‘সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি অ্যান্ড গ্রিন অ্যান্ড সাসটেইনেবল আর্কিটেকচার’ শীর্ষক আরেকটি প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়। ৪ নভেম্বরের আয়োজনে ছিল হেরিটেজ ওয়াক। প্রায় ৪৫০ বছর আগেকার সমৃদ্ধ পানাম নগরীতে নিয়ে যাওয়া হয় উত্সবে আসা স্থপতিদের। মুগ্ধ হওয়ার মতো নির্মাণশৈলী রয়েছে এই নগরের প্রতিটি ভবনে। রাস্তার দুপাশে ছড়িয়ে থাকা ভবনগুলো ঈশা খাঁর আমলে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। রাতের গা ছমছমে পরিবেশে সেদিন হঠাত্ আলোআঁধারির খেলায় ও মানুষের কোলাহলে পরিবেশ বদলে যায়। বিদেশি স্থপতিরা ঘুরে দেখেন বাংলাদেশের ঐতিহ্য। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র ও স্থপতি ইনস্টিটিউটে নির্ধারিত অনুষ্ঠানমালা চলতে থাকে। গত ৬ নভেম্বর হাতিরঝিলের মুক্তমঞ্চে জমকালো সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যে দিয়ে আর্কএশিয়ার পঞ্চাশ বছর উদযাপন করা হয়। ৭ নভেম্বর শেষদিন অনুষ্ঠিত হয় ফ্রেন্ডশিপ নাইট।

দি আর্কিটেক্টস রিজিওনাল কাউন্সিল এশিয়ার (আর্কএশিয়া) সদস্য ২১টি দেশ হলো বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, ম্যাকাউ, চীন, হংকং, জাপান, কোরিয়া ও মঙ্গোলিয়া। বর্তমানে এর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছেন বাংলাদেশি স্থপতি ড. আবু সাইদ এম আহমেদ। আর্কএশিয়া ১৯৬৭ সালে নয়াদিল্লিতে প্রতিষ্ঠিত হয়।