মনীষী

আমাদের ‘জননী সাহসিকা’

 

সুফিয়া কামালকে বাংলার মানুষ ‘জননী সাহসিকা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সুফিয়া কামাল যখন জন্মেছিলেন তখন মুসলিম নারীদের গৃহবন্দী জীবন কাটাতে হতো। স্কুল-কলেজে পড়ার কোনো সুযোগ ছিল না। পরিবারে বাংলাভাষার প্রবেশ ছিল একরকম নিষিদ্ধ। তারপরও সুফিয়া কামাল পরিবারের নানান অসুবিধার মধ্যে দিয়েও বাংলাভাষা শিখে তিনি হন স্বশিক্ষিত এবং সুশিক্ষিত। তাঁর জন্ম ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের সায়েস্তাবাদে মামার বাড়িতে। বাবার নাম সৈয়দ আবদুল বারী আর মা সৈয়দা সাবের খাতুন।

মাত্র বারো বছর বয়সে বরিশাল থেকে প্রকাশিত ‘তরুণ’ পত্রিকায় তাঁর লেখা গল্প ‘সৈনিক বধূ’ ছাপা হয়। এরপর প্রায় তিন বছর পর ‘সওগাত’ পত্রিকায় ছাপা হয় তাঁর লেখা কবিতা ‘বাসন্তী’ আর ২৬ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় গল্পগ্রন্থ ‘কেয়ার কাঁটা’। কেয়ার কাঁটা চৌদ্দটি গল্প ও একটি নাটক নিয়ে রচিত। গ্রন্থভুক্ত হওয়ার আগে এই গ্রন্থের কয়েকটি গল্প সওগাত, বুলবুল, জয়ন্তী ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশ হয়। কেয়ার কাঁটা গ্রন্থটি কবি বেনজির আহমদ প্রকাশ করেছিলেন কলকাতা থেকে ১৯৩৭ সালে। কেয়ার কাঁটা দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। প্রকাশ করেন কবিপুত্র শাহেদ কামাল।

১৯৩৮ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’ প্রকাশিত হয়। বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯৮৪ সালে রুশ ভাষায় তাঁর ‘সাঁঝের মায়া’ গ্রন্থটি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে প্রকাশিত হয়। সুফিয়া কামাল লিখেছেন ‘একালে আমাদের কাল’ নামে তাঁর আত্মজীবনী। তাঁর কবিতা চীনা, ইংরেজি, জার্মান, ইতালিয়ান, পোলিশ, রুশ, ভিয়েতনামিজ, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

২০০২ সালে বাংলা একাডেমি সুফিয়া কামালের রচনাসমগ্র প্রকাশ করে।

বেগম সুফিয়া কামাল মহাত্মা গান্ধীর সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয়ে কিছুদিন চরকায় সুতা কাটেন। সে সময় ‘মাতৃমঙ্গল’ নামে একটি নারী কল্যাণমূলক সংগঠনে যোগ দেন। ১৯২৯ সালে তিনি বেগম রোকেয়ার ‘আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতিন-ই-ইসলামে’ যোগ দেন। ১৯৩১ সালে তিনি মুসলিম নারীদের মধ্যে প্রথম ইন্ডিয়ান মহিলা ফেডারেশনের সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৪৭ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। সে সময়ের নারীবিষয়ক উপমহাদেশের প্রথম সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার তিনি ছিলেন প্রথম সম্পাদক। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সরাসরি যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম পরিষদ (বর্তমানে মহিলা পরিষদ) গঠিত হলে প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নির্বাচিত হন। এছাড়াও তিনি ছিলেন ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৬১ সালে তাঁকে পাকিস্তান সরকার ‘তঘমা-ই-ইমতিয়াজ’ নামক জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত করলেও ১৯৬৯ সালে বাঙালিদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে তিনি তা বর্জন করেন। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় সম্মানিত।

অনন্যসাধারণ এই মানুষটি প্রায় তাঁর সারা জীবন ব্যয় করেছেন মানুষের কল্যাণে। ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর ৮৯ বছর বয়সে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান না-ফেরার দেশে।

বেগম সুফিয়া কামালকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই সম্মান লাভ করেন।