একজন নারী এবং একটি শিশু

ঢাকা থেকে ভাণ্ডারিয়ায় ফিরছিলাম। মাওয়া ঘাটে এসে লঞ্চে জানালার কাছে বসে নদীর বিশালতা উপভোগ করছিলাম। মৃদু মন্দ বাতাস ঢেউয়ের ভেলায় চড়ে যখন শরীরে আছড়ে পড়ছিল, তখন অনেকটা স্মৃতিকাতর হয়ে যাচ্ছিলাম। প্রকৃতির অনাবিল উদারতার কাছে আত্মসমর্পণ করে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। হঠাত্ কারো চিত্কারে ঘুম ভেঙে গেল। চেয়ে দেখি ৪০-৪৫ বছর বয়সী এক নারী টিকেট চেকারকে তীব্র ভাষায় ভদ্রভাবে কথা বলার জন্য বলছেন। টিকেট চেকার বলছিল, ‘মালে হাত দেন, মাল বাইর করেন।’ এমন অশোভন উক্তি ওখানে বসা এত জন লোক কাউকে স্পর্শ করতে না পারলেও ঐ ভদ্রমহিলার আত্মসম্মানে লেগেছিল। অশিক্ষিত চেকার আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করছিল এবং বলছিল, ‘আমি টাকার কথা বলেছি।’ শেষ পর্যন্ত ঐ ভদ্রমহিলার দৃঢ়তার কাছে সে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়। লঞ্চটিতে তখন পিনপতন নীরবতা। যান্ত্রিকতার এই যুগে আমরা মানুষগুলো অতি যান্ত্রিক হয়ে গেছি। তাই অন্যায়, অশোভন আচরণ, অবিচার, শোষণ, নিপীড়ন আমাদের মন স্পর্শ করে না!

যাই হোক, লঞ্চ থেকে মহিলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে বিআরটিসি বাসে বসে অপেক্ষা করছিলাম। হঠাত্ ১০-১২ বছরের একটি ছেলে বাদাম বিক্রির জন্য এলো। উস্কো-খুস্কো চুল, হালকা গড়ন, সারা দেহ দারিদ্র্যের চাদরে মোড়ানো। অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে ১০ টাকার বাদাম তার কাছ থেকে কিনি। বাদামগুলো একটি প্যাকেটে দিয়ে সে আমাকে আর একটি খালি প্যাকেট দিল। কারণ জানতে চাইলে আমাকে বলল, ‘খোসাগুলো এই প্যাকেটে রাখবেন, নাহলে ময়লা হবে।’ একটা নিষ্পাপ হাসি দিয়ে ও চলে গেল। ওর গমনপথের দিকে তাকিয়ে এতোটুকু একটা বাচ্চার উপলব্ধি, দায়িত্ববোধ, সচেতনতা দেখে হতবিহ্বল হয়ে পড়ছিলাম। M. K. Rawlings-এর লেখা 'A Mother in Mannville' গল্পে jessy-র দায়িত্ববোধ তুলে ধরতে লিখেছিলেন, 'He is honest but more than honesty.' ছেলেটির মধ্যে jessy-র গুণাবলির মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম। সমাজের মহাপ্রতাপশালী উচ্চশিক্ষিত লোকেরা যখন বিবেক-মানবিকতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে আখের গোছাতে ব্যস্ত, তখন এই ছোটো ছেলেটির উপলব্ধি সকলের কাছে অনুকরণীয় হতে পারে। মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতার অনুশাসন ঘটাতে পারলে এই নাম-গোত্রহীন শিশুরাই একদিন আলোর দিশারী হয়ে জাতিকে আলোকিত পথের সন্ধান দেবে। পরিশেষে, ছেলেটির উপলব্ধির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বিখ্যাত বাণীর অবতারণা করে ইতি টানছি— 'Ask not what your country can do for you, ask what you can do for your country.'

বিশ্বাস সাইদুর রহমান

মজিদা বেগম মহিলা কলেজ,

ভাণ্ডারিয়া, পিরোজপুর