‘নবান্ন উত্সবে মিশে আছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি’

মুহাম্মদ দিদারুল আলম

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

 

‘এসো মিলি সবে নবান্নের উত্সবে’—এই শ্লোগানকে সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এবারো চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি নবান্ন উত্সবের আয়োজন করে।

গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত নবান্ন উত্সবের আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের আদিম উত্সবগুলোর একটি নবান্ন উত্সব। কৃষিভিত্তিক সভ্যতায় গড়ে ওঠা শস্যভিত্তিক এই লোকজ উত্সবটি অনুষ্ঠিত হয় বাংলার গ্রাম-গঞ্জে কৃষকের ঘরে ঘরে। নবান্ন শব্দটি শুনলেই পিঠা, পায়েস, মুড়ি-মুড়কি আর নতুন চালের ভাতের সুগন্ধে ভরে ওঠে মনটা। অন্ন বা আহার নিয়ে এই উত্সবের জন্ম। কার্তিক মাসের শুরু থেকেই দেশের বিস্তীর্ণ জনপদে ধান কাটা শুরু হয়ে যায়। অগ্রহায়ণে কৃষকের গোলা ভরে ওঠে ধান-চালে। যার ফলে কৃষি নির্ভর বাংলায় পিঠা-পুলি, চিড়া-মুড়ি নিয়ে উত্সব করার সময় এটাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ দেশের গ্রাম-গঞ্জে নবান্ন একটি সহজাত উত্সব। নবান্ন উত্সবের সঙ্গে মিশে আছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। আমাদের নতুন প্রজন্মের সন্তানদের বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য সম্পর্কে জানাতে হবে।’

অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ড. হরিশংকর জলদাস বলেন, অগ্রহায়ণের শুরুতেই দুই বাংলাতে চলে উত্সবের নানা আয়োজন। নতুন ধান কাটা আর সেই ধানের প্রথম অন্ন খাওয়াকে কেন্দ্র করে পালিত হয় নবান্ন উত্সব। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। এ যেন সত্যি হূদয়ের বন্ধনকে আরো গাঢ় করার উত্সব। হেমন্ত এলেই দিগন্তজোড়া প্রকৃতি ছেয়ে যায় হলুদ-সবুজ রঙে। এই শোভা দেখে কৃষকের মন আনন্দে ভাসতে থাকে। কারণ কৃষকের ঘর ভরে উঠবে গোলা ভরা ধানে। বছর ঘুরে আবার এসেছে অগ্রহায়ণ। বাঙালির প্রধান কৃষিজ ফল কাটার ক্ষণ। স্মরণাতীত কাল থেকে বাঙালির জীবনে পয়লা অগ্রহায়ণকে বলা হয়ে থাকে বাত্সরিক সুদিন। এ দিনকে বলা হয় নবান্ন। নবান্ন হচ্ছে হেমন্তের প্রাণ। নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি করা হয় পিঠা, পায়েস, ক্ষীরসহ হরেকরকমের খাবার। বাড়ির আঙিনা নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধে ভরে ওঠে। চিরায়ত বাংলার চিরচেনা রূপ এটি। কৃষকের মাঠে এখন সোনারঙা ধানের ছড়াছড়ি। সারাদেশেই আমন ধান কাটার উত্সব শুরু হয়ে গেছে। ধান ভাঙার গান ভেসে বেড়ায় বাতাসে, ঢেঁকির তালে মুখর হয় বাড়ির আঙিনা। অবশ্য যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় এখন আর ঢেঁকির তালে মুখরিত হয় না। তারপরও নতুন চালের ভাত নানা ব্যাঞ্জনে মুখে দেওয়া হয় আনন্দঘন পরিবেশে। তৈরি হবে নতুন চালের পিঠা, ক্ষীর-পায়েস। কৃষক-কৃষাণিরা নবান্নের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। হাজার বছরের পুরোনো এই উত্সব সবচেয়ে অসাম্প্রদায়িক, সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী এবং সবচেয়ে প্রাচীনতম মাটির সঙ্গে চিরবন্ধন যুক্ত।

চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর কবিরের সভাপতিত্বে ও কবি ফারুক তাহেরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত নবান্ন উত্সবে স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমি কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বাবু। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন শিল্পকলা একাডেমির জেলা কালচারাল অফিসার মোসলেম উদ্দিন সিকদার লিটন ও একাডেমির সদস্য সাংবাদিক রনজিত কুমার শীল। আলোচনা সভা শেষে জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও অন্যান্য সংগঠনের শিল্পীরা সমবেত সংগীত, দলীয় নৃত্য, একক সংগীত, একক আবৃত্তি ও পুঁথি পরিবেশন করেন।