সম্মাননা বা পুরস্কার সবসময়ই কাজে উত্সাহ জোগায়

—আবদুস শাকুর শাহ

আবদুস শাকুর শাহ তাঁর ক্যানভাসে আমাদের লোক ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। তাঁর ফ্রেমে তুলে এনেছেন মৈমনসিংহ গীতিকার চরিত্র মহুয়া, মলুয়া, নদের চাঁদ, চন্দ্রাবতীর আখ্যান। বিষয় পুরনো হলেও তার রং-রেখায় আধুনিকতা স্পষ্ট। তিনি ১৯৪৬ সালে বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) থেকে বিএফএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে ফাইন আর্টে পোস্ট ডিপ্লোমা করেন এমএস বিশ্ববিদ্যালয়, বরোদা, ভারত থেকে। এরই মধ্যে ২৩টি একক চিত্রপ্রদর্শনী ছাড়াও বহু দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি ২০০৮ সালে এস এম সুলতান পদক এবং ২০১৪ সালে জাপান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পদকসহ আরো অনেক পুরস্কার লাভ করেন। আবদুস শাকুর শাহ এবারের ‘বার্জার ইয়ং পেইন্টার্স আর্ট কম্পিটিশন-২০১৯’-এ পেয়েছেন আজীবন সম্মাননা। ্এসব প্রসঙ্গে এই গুণী শিল্পীর সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন—

মোহাম্মদ আসাদ

স্বাধীন বাংলাদেশের শিল্পকলা নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কী?

আবদুস শাকুর শাহ :বাংলাদেশ হওয়ার পরই শিল্পকলার পরিবর্তনটা শুরু হয়। শিল্প, সহিত্য, গান ও চলচ্চিত্রের মধ্যেও পরিবর্তনটা আসে। সেটা অনেকে ধরতেও পারছিল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখানে সারা পৃথিবীর সকল দেশের অ্যাম্বাসি হলো। তখন এই অ্যাম্বাসি-কেন্দ্রিক একটি শিল্পকলার বাজার গড়ে উঠল। সেটা অতি ছোট মার্কেট ছিল। তারপরও সেটাই অনেক বেশি উত্সাহের ছিল। তারপর ছবি বিক্রি, সংগ্রহ বা দেখার একটা প্রভাব পড়ল শিল্পচর্চার ওপর। এই প্রভাব চলল দীর্ঘদিন। বিদেশিরা আমাদের শিল্পকলাকে গ্রহণ করল। আমাদের কাজ দেখে বলল—বাঙালির কাজ ভালো, বাংলাদেশের আর্ট একটা আলাদা রূপ নিচ্ছে। আমাদের এখানে পিওর অ্যাবস্ট্রাক্ট এল, ফিগারেটিভ এবং বিষয়ভিত্তিক কাজ শুরু হলো। আমাদের ক্যানভাসে বিষয় হিসেবে এল বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু। মুক্তিযুদ্ধ এল। এভাবে অনেক বিষয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের আর্টকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টার করা হলো। এটার জন্য শিল্পী-সাহিত্যিকদের অনেক অবদান রয়েছে।

 

শিল্পকর্মে বাংলাদেশ থাকা কি জরুরি?

আবদুস শাকুর শাহ :বলা হয় ছবিতে আন্তর্জাতিকতা। সেটা অবশ্যই থাকতে পারে। আমরা কাজের মধ্যে কীভাবে বাংলাদেশ আনব। এখানে বিষয়গুলো অনেকভাবে এসেছে। বিদেশিরা আমাদের প্রদর্শনীতে এল, ছবি সংগ্রহ করল। যার কারণে প্রদর্শনীর সংখ্যা বেড়ে গেল। শিল্পীদের ছবি আঁকা বেড়ে গেল। শিল্পীসংখ্যাও বৃদ্ধি পেল। সিনিয়র শিল্পীদের সঙ্গে তরুণ শিল্পীরা এল। প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীরা এল। শিল্পকলায় ব্যাপক পরিবর্তন আসতে লাগল। আমরা দেখলাম ইনস্টলেশন এল। ভিডিও আর্ট এল। পারফর্মিং আর্ট এল। অনেকগুলো নতুন বিষয় এল। সেখানে বাংলার বিষয়টা অনেকেই এনেছেন। মডার্ন রং-রেখা দিয়ে নির্মাণ করেছেন সেই কাজ। বাংলাদেশ হওয়ার পর ন্যাশনাল এক্সিবিশন শুরু হলো। শুরু হলো এশিয়ান বিয়েনাল। এটার একটা প্রভাব ব্যাপকভাবে পড়ল শিল্পীদের মাঝে। এটা শুধু দেশে নয়, বিদেশেও আমাদের শিল্পীদের পরিচিতি এনে দিল। আজকে বলতে পারি, আমাদের শিল্পকলা একটি ভালো অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন শিল্পীদের খেয়াল রাখতে হবে শিল্প সৃষ্টি করতে গিয়ে যেন বাধার সৃষ্টি না করে ফেলি। আমি এমন একটা শিল্পকর্ম করলাম যেটা দেশের বিরুদ্ধে যায়। এমন শিল্পচর্চা যেন না হয়।

 

তরুণদের শিল্পচর্চাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আবদুস শাকুর শাহ :এখন যারা তরুণ প্রজন্ম তারাও ভালো করছে। অনেকে চর্চাটা কম করছে। কিছু আছে সাংঘাতিক তত্পর, ভালোভাবে চর্চা করছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তারা অংশগ্রহণ করছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় তারা ওয়ার্কশপ করছে। কিছু আছে সুযোগ-সুবিধা না পাওয়াতে ওই ধরনের চিন্তাভাবনা হয়তো কম। তার কারণে তারা খুব বেশি দূর এগোতে পারছে না। অনেকই শুরু করে, কিন্তু টিকে থাকতে পারে না। এরা দুই যুগ ধরে তরুণদের উত্সাহ দিয়ে চলেছে। এটা কম কথা নয়।

 

নাম ‘ইয়ং পেইন্টার্স আর্ট কম্পিটিশন’ সেখানে গুণীজন সম্মাননার বিষয়টি কীভাবে এল?

আবদুস শাকুর শাহ :আজ থেকে ২৪ বছর আগে যখন শুরু হয় তখন শুধু তরুণদের পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। শুরুতে রফিকুন নবী, আমিসহ এর সঙ্গে ছিলাম। তবে সব সিনিয়র শিল্পীরা এর জুড়ি বোর্ডের মেম্বার ছিলেন। এখন যিনি এমডি তিনি (রূপালী চৌধুরী) একটা পর্যায়ে এসে ভাবলেন ইয়ংদের সঙ্গে গুণীজনদের সম্মাননা দেওয়া যায় কিনা। সেভাবেই কাজ শুরু হলো। প্রথম বছর গুণীজন সংর্ধনা দেওয়া হয় স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে। পরে স্থপতিদের প্রতিযোগিতা আলাদা হয়ে যাওয়ায় গুণী শিল্পীদেরই আজীবন সম্মাননা দেওয়া হতে থাকে। প্রথম থেকেই একটা সিদ্ধান্ত ছিল—এই গুণী শিল্পী ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে পাশ করা হতে হবে। সেই হিসেবে প্রথমে দেওয়া হয় শিল্পী আমিনুল ইসলামকে। তারপর দেওয়া হয় শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, আবদুর রাজ্জাক, মুস্তাফা মনোয়ারকে। মুস্তাফা মনোয়ার পাশ করেছিলেন কলকাতা থেকে। তবে এখানে শিক্ষকতা করার কারণে তাঁকে দেওয়া হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে নিচের দিকে আসতে থাকে। তারপর শিল্পী রফিকুন নবী, হাশেম খান, আবু তাহের, মাহমুদুল হক, আবুল বারাক আলভী তারপর পেলাম আমি।

 

একটি  আজীবন সম্মাননা পাওয়ায় আপনার অনুভূতি কী?

আবদুস শাকুর শাহ :সম্মাননা বা পুরস্কার সবসময়ই কাজে উত্সাহ জোগায়। একটা নামকরা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্মাননা পেলে আরো ভালো লাগে। এই সম্মাননার কারণে আরো উত্সাহিত হব। হয়তো কাজে আরো একটু গতি আসবে। এরকম অনুভূতি হয় আর কি। সহজ কথায়—ভালো লেগেছে, খুশি হয়েছি। এর মাধ্যমে আরো উত্সাহিত হলাম। আগে এমডি এবং চেয়ারম্যান এই সম্মাননা তুলে দিতেন। এবার সিনিয়র শিল্পী মনির ভাই (মনিরুল ইসলাম) ছিলেন। আলভী সাহেব, আরো যাঁরা শিল্পী ছিলেন সকলকেই মঞ্চে আসার অনুরোধ করা হলো। বিষয়টা সত্যিই উপভোগ্য হয়ছিল। আমার জীবনে এই দিনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।