মুক্তিযুদ্ধ—শব্দটা শুনলেই গর্বে যেকোনো বাঙালির বুক ফুলে উঠবে। ছোটবেলায় অনেকেই বাবা-মা অথবা দাদা-দাদির কাছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছেন, গল্পের ফাঁকে ফাঁকে কখনো দেশাত্মবোধক গান শোনা ও মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র দেখেছেন। গল্প, গান ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে হূদয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বীজ বোনা হয়েছিল সেই ছোটবেলায়। তবে এ প্রজন্মের অনেকেরই হয়তো এ বিষয়গুলোকে সেভাবে অনুভব করার সুযোগ হয়নি। আগের প্রজন্মকে দাদা-দাদি বা বাবা-মা নিজেদের চোখে দেখা ঘটনাগুলোকে গল্পের ছলে বলে যেভাবে জানাতেন যুদ্ধের ইতিহাস, তেমন সুযোগ এখন আর সবার ভাগ্যেও জোটে না। কিন্তু ইতিহাসচর্চায় থেমে থাকলে তো চলবে না।
কিছুদিন আগেও ইতিহাসকে শুধু কাগজে লিখে সংরক্ষণ করা হতো। প্রযুক্তির আধুনিকায়নের ফলে পুরো বিষয়টি এখন বদলে গেছে। এখন তথ্য সংরক্ষণ ও ইতিহাসকে ছড়িয়ে দেওয়া অনেক সহজ। তাই নতুন প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস পৌঁছে দিতে প্রযুক্তি ব্যবহার করেই কার্যকরী নানা পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যার কিছু নমুনা ইতোমধ্যেই দেখা গেছে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসকে জানা ও চর্চার করার উপায় খুঁজতে গেলে শুরুতেই আসবে যুদ্ধের ঘটনা নিয়ে লেখা বই ও চলচ্চিত্রের কথা। এর সঙ্গে ইদানীং সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভিডি গেমসও!
অনেক বাবা-মায়েরা সন্তানের হাতে মুক্তিযুদ্ধের বই তুলে দেন। যুদ্ধের ভয়াল গল্পগুলো পড়তে পড়তে শিউরে ওঠার সময় সবারই সাধ জাগে, যদি অস্ত্র হাতে দেশের জন্য যুদ্ধে যেতে পারতাম! দেশকে যদি শত্রুমুক্ত করতে পারতাম! সেই বইয়ের গল্পগুলো দেশপ্রেম তৈরির অনন্য মাধ্যম হয়ে ওঠে। আর দেশপ্রেমের এ অনুভূতি হূদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও বাস্তবে তো যুদ্ধে যাওয়া সম্ভব নয়। তাহলে? নতুন প্রজন্ম যেন মুক্তিযুদ্ধকে উপলব্ধি করতে পারে, সে প্রয়াসে দেশীয় ডেভেলপাররা কয়েকটি গেম তৈরি করেছেন। একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারা কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যুদ্ধ করেছেন, সে সময়টাকেও অনুধাবন করা যাচ্ছে এসব গেমের মাধ্যমে। স্মার্টফোন বা কম্পিউটারে গেমগুলো খেলতে খেলতে হানাদারদের তাড়ানোর আনন্দ তো মিলবেই, সঙ্গে জানা যাবে ইতিহাসের নানা অধ্যায়! পঁচিশে মার্চের কালরাত্রিতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পাকবাহিনীর হামলা থেকে শুরু করে ষোলো ডিসেম্বরের বিজয়মহ অনেক ঘটনাপ্রবাহ গেমগুলোতে উঠে এসেছে। আর ইতিহাস জানতে চাইলে অনলাইনে তরুণেরা ইন্টারনেটে মুহূর্তের মধ্যেই এক ক্লিকে বিভিন্ন ওয়েবপোর্টালে তা বের করতে পারছেন। আছে বেশকিছু অ্যাপ।
গেমস তো গেল একটি মাধ্যম। আরেকটি আকর্ষণীয় মাধ্যম হলো সিনেমা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বেশকিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো বেশ পুরোনো। নতুন করে এ নিয়ে কতটা কাজ হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আগের প্রজন্ম যেমন সাদাকালো সিনেমা দেখেই মনের খোড়াক জোগাতেন, এখনকার প্রজন্ম তো তেমনটা চায় না, প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে সবকিছুই দখল করে নিয়েছে হাই-ডেফিনেশন কন্টেন্ট। তাই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে উচ্চমানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হলে তা এখন ব্যাপকভাবে সমাদৃত হতো, পাশাপাশি প্রচুর তরুণের কাছে পৌঁছে যেত ইতিহাস। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দিকেও তাকালেও দেখা যায় ইতিহাসের নানা ঘটনার উপর দারুণ সব চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হচ্ছে। দেশীয় চলচ্চিত্রে এটা অনুসরণ করা উচিত।
সবসময় নিজ দেশীয় সংস্কৃতি, নিজের ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নিজস্ব কন্টেন্ট খোঁজার আগ্রহটা সবার মধ্যেই কাজ করে। যেমন যুদ্ধের গেম খেলতে খেলতেও অনেকে অনুভব করতেন, যদি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো গেম থাকত! আবার হলিউড বা বলিউডের হাই-ডেফিনেশন সিনেমাগুলো দেখার সময়ও একই অনুভূতি হয়, মনে হয় নিজস্ব কন্টেন্টের জায়গায় অনেক ঘাটতি আছে। এখন থেকে এ বিষয়ে কাজ করতে হবে। চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করতে হবে, মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমের গানগুলোকে নতুন করে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে দিতে হবে, পাশাপাশি প্রযুক্তিগতভাবে ইতিহাসচর্চার যে সুযোগ এখন তৈরি হচ্ছে, সেগুলোকেও পৃষ্ঠপোষকতা করতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে আসতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, তরুণেরা আগ্রহী। যেমন গেম ও অ্যাপগুলোও প্রচুর পরিমাণে ডাউনলোড হচ্ছে। এটা প্রমাণ করে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নিত্যনতুন কন্টেন্ট সবাইকে আকৃষ্ট করছে। চলচ্চিত্র তৈরি হলেও তা আকর্ষণ কেড়ে নেবে। নিত্যনতুন মাধ্যমগুলোই করবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বীজবপন। এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যাক সঠিক ইতিহাস। গড়ে উঠুক দেশপ্রেমিক প্রজন্ম।