ত রু ণ দে র ভা ব না

আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম

শিক্ষার্থী, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

 

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চার পাশাপাশি তা নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়াও পূর্বসূরিদের কর্তব্য। শুধু ইতিহাসের বই লিখে তা কখনোই সম্ভব না? এর জন্য সিনেমা, নাটক, গান, উপন্যাস, থিয়েটারের সাহায্য অবশ্যই নিতে হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ওপর অনেক সিনেমা নির্মিত হয়েছে। তবুও কোথায় যেন ঘাটতি রয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা শুধু গোলাগুলি, যুদ্ধ আর পাকবাহিনীর নির্যাতনের সিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত না। এর বিস্তৃতি আরও ব্যাপক ও বিস্তর। একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর সংখ্যার হিসেবে নয় মাস হলেও ইতিহাসের গুরুত্বে এর সময়কাল অনেক দীর্ঘ। দীর্ঘ সময়কালকে দুই ঘণ্টার কাহিনিতে ফুটিয়ে তোলা যাবে না।

ইতিহাসের প্রতিটি পাতা থেকেই একেকটি সিনেমা হতে পারে। আমাদের শুরু করতে হবে ১৯৪৮ সাল থেকে। নাহলে একাত্তরের তাত্পর্য নতুন প্রজন্ম কখনোই বুঝতে পারবে না। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা কিংবা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে কোনো সিনেমার আছে বলে জানা নেই। এইদিকগুলোতে আমাদের অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে।

মুক্তিযুদ্ধ ওপর ভিত্তি করে অনেক গেমও বানানো হচ্ছে, যা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। এভাবে প্রযুক্তিনির্ভর পন্থাকে সদ্ব্যবহার করে ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা যেতে পারে। জাতি হিসেবে সংস্কৃতির দিক দিয়ে আমরা অনেক স্বয়ংসম্পূর্ণ। একে আমরা আরও সম্পূর্ণ করতে পারি ইতিহাস তুলে ধরার মাধ্যমে। এর মাধ্যমে ইতিহাসের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ হবে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস তুলে দেওয়ার দায়িত্বও পালন হবে।

 

ফারজিয়া হক ফারিন

শিক্ষার্থী, থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

বাঙালি জাতির সবচেয়ে গৌরবময় উপাখ্যান মুক্তিযুদ্ধ। যদিও যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অনেকভাবে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটেছে, তবু আশার কথা নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানানোর প্রচেষ্টা চলছে। তবে মাঝে মাঝে তা অপ্রতুল মনে হয়, কারণ আমরা যারা মূলধারার শিক্ষা-সংস্কৃতির সাথে যুক্ত, তারা ঘুরেফিরে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানছি, মাতামাতি করছি, আবেগতাড়িত হচ্ছি কিন্তু সর্বোপরি সবাই কি সেই সুযোগটা পাচ্ছে? তাহলে তারা বুঝবে কীভাবে পূর্বপুরুষদের কত ত্যাগের বিনিময়ে আমরা মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারছি? দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে বিশাল ভার এই প্রজন্মের ওপর, ইতিহাস না জানলে সেই ভার বহনের শক্তি আসবে কোথা থেকে?

সব মানুষের কাছে যদি পৌঁছাতে হলে মাধ্যমটাও সর্বজনবোধ্য হতে হবে। পত্রপত্রিকা আর টকশোর কথা যে মানুষ বুঝতে পারে না, সহজ ভাষায় লেখা একটা গানকে কিন্তু সে ঠিকই মনে গেঁথে নেয়।

এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান শহরকেন্দ্রিক না হয়ে গ্রামে হতে পারে? সেখানে সেই নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষজন যদি অংশ নেয়, ওই অঞ্চলের যুদ্ধের গল্প, ওই অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের কাহিনি বলা হয়, তাহলে আগ্রহ তৈরি হবে।

দেশ এগোচ্ছে, বিজ্ঞান-শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছি। এখন আমাদের গৌরবগাথা বিশ্বকে জানানোর সময়। এ জন্য প্রয়োজন বিশ্বমানের কনটেন্ট তৈরি করা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উচ্চতর পর্যায়ে আরো গবেষণা করা উচিত, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করা উচিত।

ধর্ম-বর্ণ-মত নির্বিশেষে বাঙালি জাতি যেদিন মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে এক ও অভিন্ন হবে, সেটিই হবে শহীদদের প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।

 

নির্বাচিতা চক্রবর্তী

শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

মুক্তিযুদ্ধের কথা এলেই শোক দিবস, স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয় দিবসের কথা চলে আসে। দিনগুলোকে উদযাপন করতে নানা আয়োজন করা হয়, যার বড় অংশজুড়ে থাকে তরুণদের অংশগ্রহণ। বিষয়টি প্রশংসনীয় বটে। তবে মুদ্রার উল্টোপিঠটাও দেখা জরুরি। বিশেষ জাতীয় দিবস ছাড়া অন্যান্য দিনগুলোতে কি জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার কিংবা মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য স্থাপনাগুলো যথাযথ সম্মান পাচ্ছে? জুতা পরে স্থাপনায় ওঠা কিংবা ময়লা-আবর্জনা ফেলা স্থাপনার অবমাননা তো পরিচিত দৃশ্য। তাহলে ধরে নিতেই হয় তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ এখনও ততটা গুরুত্ব নিয়ে এখনও পৌঁছায়নি। তবে এটাও ঠিক তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ চেষ্টা করে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার। ‘গেরিলা’র মতো চলচ্চিত্র কিংবা ‘হিরোজ অব ৭১’-এর মতো গেমগুলোর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা যথেষ্টই প্রশংসার যোগ্য। একইসাথে মুক্তিযুদ্ধের ওপর স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি কিংবা উচ্চমানসম্পন্ন আরও চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যায়। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানাতে ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরেরও জুড়ি নেই। জাদুঘর প্রাঙ্গণে আকর্ষণীয় সব অনুষ্ঠানের আয়োজন তরুণদেরকে আরও আকৃষ্ট করবে। অনেকেই এফএম রেডিও শোনেন, তা তীব্র যানজটেই হোক বা নির্ঘুম রাতে। রেডিও চ্যানেলগুলো মুক্তিযুদ্ধের ওপর শ্রুতিনাটক নির্মাণ করতে পারে। এক্ষেত্রে যুদ্ধের ওপর লেখা কালজয়ী সব বইগুলোকেও নাট্যরূপ দেওয়া যেতে পারে। এমন সব পন্থা অবলম্বন করে খুব সহজেই তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করা যায়। ভবিষ্যতে যে তরুণেরা দেশ গড়বে শিকড়টা যে তাদের জানতেই হবে, নইলে সুদিন আসবে কী করে!

 

নন্দিনী কর্মকার প্রাচী

শিক্ষার্থী, অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার, আমাদের চেতনা ও আমাদের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। এই বাক্যগুলোর সঙ্গে আমাদের ছোটবেলা থেকেই পরিচয়। কিন্তু সত্যিকার অর্থে তা ধারণ করি কতটা? ছোটবেলায় আমি মুক্তিযুদ্ধকে চিনেছি দাদু, ঠাম্মার কাছে গল্প শুনে। গল্পগুলোর চিত্রপট মনে মনে ভেবে নিয়েছিলাম নিজের মতো করে। তারপর আরেকটু বড় হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন চলচ্চিত্র, নাটক দেখলাম। আমার ভেবে নেওয়া চিত্রপটের সাথে ওইগুলোর তুলনা করতে গিয়ে দেখলাম স্বাভাবিকভাবেই সেগুলো আমার চিন্তাধারাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

যুবসমাজ এখন কতটা প্রযুক্তিনির্ভর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তরুণ বয়সী ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন অনলাইন গেমসসহ নানা রকম গেমেসর উপর দারুণভাবে আকৃষ্ট। সেদিক বিবেচনা করে ডেভেলপাররা মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে সাজিয়েছেন বিভিন্ন গেমস। বিষয়গুলো প্রশংসার দাবিদার। তবে তা পুরোপুরি বিস্তৃত নয় এখনো। যুগোপযোগী কন্টেন্ট নির্মাণে বড় পরিসরে উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের বাবা-মায়েদের সময়ে তারা সাদাকালো রিলের সিনেমা দেখেই সন্তুষ্ট থাকতেন, কিন্তু এখন সবকিছুতে হাই-ডেফিনেশন থাকতে হয়, নাহলে মানুষ তা পছন্দ করে না। মুক্তিযুদ্ধের কাহিনিনির্ভর নতুন ও উচ্চমানের চলচ্চিত্র বানাতে হবে। আর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গেমস ও অন্যান্য ভিজুয়াল কন্টেন্ট নিয়ে যারা কাজ করছেন, তাদেরও পৃষ্ঠপোষকতার জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। এধরনের কন্টেন্টের জনপ্রিয়তা যত বাড়বে, ততই ইতিহাসও ছড়াবে।

আমাদের অগ্রজরা মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের দিয়ে গেছেন স্বাধীনতা, সেই স্বাধীনতার মর্মোপলব্ধি করার জন্য প্রয়োজন আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগকে উপলব্ধি করলেই দেশাত্মবোধ পাবে নতুন মাত্রা।