লোহাগাড়ায় কৃষি জমিতে ইটভাটা!

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার ইটভাটাগুলো কৃষি জমির উপরে বছরের পর বছর ধরে অবাধে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এমন কি ভাটার পার্শ্ববর্তী কৃষি ও বনভূমিতেও ব্যাপ্তি ছড়িয়ে আছে ইটভাটাগুলো। ফলে নয়টি ইউনিয়নে বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে ইটভাটায় ইট পোড়াতে কাঠের ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও জ্বালানি হিসেবে অবাধে কাঠ ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। জানা গেছে, সম্প্র্রতি উপজেলার বড়হাতিয়া এলাকায় একটি ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে কাঠ জব্দ করেছে বন বিভাগ।

ইটভাটা করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স ও কৃষি বিভাগের অনুমতিপত্র লাগে। এসব ইটভাটার বৈধতা নিয়ে  প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলায় কৃষি জমিতে, লোকালয়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে, রাস্তার পাশে ও পাহাড়-বনাঞ্চলের পাশে এসব ইটভাটা গড়ে উঠেছে। ইটভাটার চিমনি দিয়ে গরম ছাইয়ের কণা নিকটবর্তী কৃষি জমিতে পড়ার কারণে জমির ফসল ও মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাছাড়া ভাটায় ট্রাকের বেপরোয়া যাতায়াত, ইটের কণা চারপাশে ছড়িয়ে পড়াসহ বিভিন্ন কারণে  বহু কৃষি জমি চাষাবাদ হয়নি। ইটভাটার কারণে উপজেলার অসংখ্য কৃষি জমিতে ফলনও কমে যাচ্ছে।

জানা যায়, গত ১০ বছরে প্রায় আড়াই হাজার একর জমি ইটভাটাসহ বিভিন্নভাবে অকৃষি শ্রেণিতে চলে যাচ্ছে। গড়ে প্রতিদিন ০.০৯ হেক্টর জমি চলে যাচ্ছে অকৃষিতে। বর্তমানে উপজেলার শত শত একর কৃষি জমি ইটভাটার দখলে। আর ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে ধানের ফলন হ্রাস পাচ্ছে। এতে প্রতিবছর বোরো ও আমন মৌসুমে চাল উত্পাদন কমছে। যেসব কৃষি জমি থেকে ভাটার টপসয়েল যোগাড় করা হচ্ছে সেসব জমির উত্পাদনও কমছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভাটা মালিক জানান, গত বছর লোহাগাড়ায় ৪০টি ইটভাটায় ইট উত্পাদন হয়েছে। স্থানীয় সূত্রমতে, লোহাগাড়ায় অর্ধশতাধিক ইটভাটা রয়েছে। শুধু চরম্বা ইউনিয়নে রয়েছে ২১টি। বনাঞ্চলের পাশে, লোকালয়ে ও কৃষি জমিতে এসব ইটভাটা অবস্থিত। তবে প্রায়ই ইটভাটা কৃষি জমির ওপর এবং প্রতিটি ইটভাটায় কৃষি জমি লেগেছে প্রায় ৭ একর। ইটভাটায় ব্যবহার হচ্ছে কৃষি জমির ওপরের উর্বর মাটি। ইটভাটায় পাহাড় ও টিলা কাটা নিষেধ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। ফলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম জানান, তিন ফসলি জমিতে ইটভাটা করার কোনো নিয়ম নেই। কৃষি জমির টপসয়েল নিয়ে গেলে প্রথম দুই বছর প্রায় ৭০ ভাগ ফসল কমে যায়। কৃষি জমির টপসয়েল চলে গেলে আগামী ৮/১০ বছরে জমির স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসা কঠিন। উপজেলা পরিষদের সমন্বয় সভায় কৃষি জমিতে ইটভাটা তৈরি না করার জন্য জোরালো প্রস্তাব রাখা হয়। নতুন এলাকার কৃষকদেরকেও কৃষি জমির টপসয়েল বিক্রি করতে নিষেধ করা হয়েছে। কৃষি জমির টপসয়েল ইটভাটায় যেন ব্যবহার করতে না পারে তার জন্য কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তৌছিফ আহমেদ জানান, লোহাগাড়ায় ইটভাটাগুলো একদিনে গড়ে ওঠেনি। এখানে অবৈধভাবে কোনো ইটভাটা পরিচালিত হতে পারবে না। অবৈধ ও অনুমোদনহীন ইটভাটার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইটভাটায় কৃষি জমির টপসয়েল ব্যবহার ও পাহাড়ের মাটি কাটার বিরুদ্ধে প্রশাসন সবসময় জিরো টলারেন্সে। লোহাগাড়ায় ইটভাটাগুলো অধিকাংশ ইটভাটা কৃষি জমির ওপর। উপজেলায় যেহারে কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে পরিবেশ ও খাদ্য উত্পাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইটভাটা পরিবেশবান্ধব করা না গেলে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে।