‘হুজুকে বাঙালি’ বলে একটা কথা আছে। তাই হয়তো গভীর রাতে বাঁশের পানি খেয়ে রোগ বিয়োগ হওয়ার পরিবর্তে ঠান্ডা সারার জন্য সকালে ডাক্তারের কাছে গিয়েছি। আড়াই শ টাকায় পেঁয়াজ কিনেছি, লবণ নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছি।
ঘটনাটি কয়েক বছর আগের। মধ্যরাতে হঠাত্ ছোটো বোনটি ফোন করে বলল, ‘ভাই তাড়াতাড়ি একটা জগ নিয়ে আমাদের বাঁশবাগানে আয়। বাঁশগাছ থেকে পানি বের হচ্ছে। এই পানি যে কোনো একটি রোগের নাম করে খেলে তা ভালো হয়ে যাবে। তুই তাড়াতাড়ি আয়...।’ বলতে বলতে ও ফোনটা কেটে দিল। কিছুক্ষণ পর আমি ফোন করে ওকে বললাম, ‘বাঁশগাছের পানি আমি খাব না।’ ওদের বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ির পথ পাঁচ মিনিটের। ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে ও এক জগ বাঁশগাছের পানি নিয়ে হাজির। বলল, ‘আল্লাহ নাম করে খা। তোর গ্যাসের সমস্যা আর থাকবে না।’ সকালে শুনি শুধু আমি না, সারা গ্রামের মানুষ রোগমুক্তির আশায় গভীর রাতে বাঁশগাছ থেকে সেই শীতল পানি সংগ্রহ করে খেয়েছে। ঠান্ডাজনিত কারণে ঐ শীতল পানি খেয়ে আর কাউকে ডাক্তারের কাছে যেতে না হলেও আমাকে যেতে হয়েছিল।
বাজার করার সময় অধিকাংশ সময় এক কেজি করে পেঁয়াজ কেনা হয়। সেদিনও দোকানিকে এক কেজি পেঁয়াজ দিতে বলায় সে বলল, ‘ভাই একটু বেশি করে নেন। ইন্ডিয়া পেঁয়াজ দেবে না, দাম বেড়ে যাবে।’ আমি বললাম, ১৫ টাকার পেঁয়াজ এখন ৩৫ টাকায় কিনছি, আর কত বাড়বে? ৫ দিন পরে দোকানি বলল, ‘ভাই, আজ পেঁয়াজ ৭০ টাকা কেজি।’ আগের মতোই এক কেজি কিনলাম। দুই দিন পরে পেঁয়াজ ঝাঁজ ছাড়তে শুরু করেছে। তখন বাজার দর ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি। তার একদিন পরে সকালে বাজারে গিয়ে দেখলাম পেঁয়াজের ঝাঁজ ২০০ টাকা ছুঁয়েছে। খবরটি মনে হয় প্রশাসনের কাছে পৌঁছেচে। তাই ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাকিম এসে কিছু খুচরা বিক্রেতাকে জরিমানা করছেন। যতক্ষণ ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাকিম ছিলেন, ততক্ষণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছিল কেজিতে ৫০ টাকা কমে অর্থাত্ ১৫০ টাকায়। সুচতুর ব্যবসায়ীরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাকিম চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ১০০ টাকা বাড়িয়ে দেন। পরের দিন ২৫০ টাকায় কিনতে হলো এক কেজি ‘পেঁয়াজরত্ন’। মনে হলো পেঁয়াজ তো সব সময় রান্নাঘরে গৃহিণীকে কাঁদায়, এখন গৃহকর্তাকে কাঁদাচ্ছে।
কথা বলছিলাম কয়েকজন। হঠাত্ লেন্টু ভাই ফোন আলাপের পর অনুজ রাসেলকে বললেন, ‘শিগগিরি গিয়ে দুই কেজি লবণ কিনে নিয়ে আয়। লবণের দাম বেড়ে গেছে। ঢাকায় লবণ পাওয়া যাচ্ছে না।’ কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই আমরা সবাই দৌড়ালাম লবণ কিনতে। দোকানে গিয়ে লবণ চাইতে দোকানি বললেন, ‘এদের আগে দিয়ে নিই।’ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার মতো অনেকে এসে হাজির হয়েছেন লবণ কিনতে। তবে, মেঘ ভেদ করে সূর্যের আলোর মতো একটি খবর এলো—এটা গুজব। সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিও নেমে পড়েছেন ভোক্তার পিঠ বাঁচাতে। মাইকে শুনতে পেলাম, ‘গুজবে কান দিবেন না, বেশি দামে লবণ বিক্রি করবেন না।’
আমরা রক্ত দিয়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছি। ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি, তার পরও কি আমরা থাকব ‘হুজুগে বাঙালি’? নিশ্চয় না। আসুন আমরা সবাই সজাগ হই।
যশোর