অণুভাবনা

আহ্ অনুভব!

মিরপুর থেকে শাহবাগ আসতে যে কী পরিমাণ ঝক্কি পোহাতে হয় তা শুধু মিরপুরবাসীই জানেন। মেট্রোরেল কতকাল যে ভোগাবে কে জানে?

বাস থেকে শাহবাগ নেমে সোজা দক্ষিণ দিকে হাঁটতে থাকি। জাদুঘর, পাবলিক লাইব্রেরি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মাজার পার হয়ে ডানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পড়ি। হাঁটতে হাঁটতে ডানে-বাঁয়ে লাইব্রেরি, মধুর কেন্টিন, ডাকসু ভবন পেরিয়ে কলাভবনের দিকে এগুচ্ছি।

পাশ করে বেরিয়েছি পঁচিশ বছর আগে। এখনো মনে হয় এই তো সেদিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশাখী বাসে চড়ে মিরপুর ১৩ নম্বর থেকে আসতাম। বাসের কন্ডাক্টর মিলন মামার হাসিমাখা চেহারাটা এখনো স্পষ্ট মনে আছে। যতবার এই ক্যাম্পাসে আসা পড়ে, বয়সের পারদ যেন উপর থেকে নেমে একুশ-বাইশে এসে ঠেকে। ইচ্ছে করেই শার্টের বুকের কাছের ওপরের বোতামটা খুলে রাখি। ঘরে বাইশ বছরের মেয়ে আছে, ভুলে যাই। ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ত এবার।

ক্যাম্পাসে এসে যদি মাথা নিচু করে খানিকটা কুঁজো হয়ে হাঁটি তাহলে কি মানায়? নিজেকে বিশাল আমগাছের ছায়ায় কিংবা কলাভবনের সামনের ছোটো মাঠটায় খুঁঁজে ফিরি।

অগ্রহায়ণের তিন তারিখ। গাছ থেকে দু-একটা মরাপাতা ঝরে পড়ছে। বুক থেকে কেন যেন দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। ২৩ নভেম্বর বাংলা বিভাগের অ্যালামনাই হবে টিএসসিতে, এসেছি রেজিস্ট্রেশন করার জন্য। কলাভবনের সিঁড়ি মাড়িয়ে দোতলায় উঠছি। একটি মুখ ভেসে উঠল চোখের সামনে। কতকাল আগের সেই মুখখানি। এখনো স্পষ্ট মনে আছে। উজ্জ্বল শ্যামলা বরণ। হালকা বেগুনি রং বোধহয় তার খুব পছন্দ ছিল। বুকের ভেতর যেন বরফ রাখা কাচের গ্লাসটা একটু নড়ে উঠল। খানিকটা পানি গ্লাস থেকে ছলকে গড়িয়ে পড়ল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল ছুঁইছুঁই। বাংলা বিভাগের লম্বা কড়িডরটা খালি। মনে আছে শীতের সকালে ক্লাস শুরুর আগে এই কড়িডরে সূর্য মহাশয়ের কাছ থেকে একটু উষ্ণতা পাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতাম শিমুল-বীণা-রুবীর সঙ্গে। সঙ্গে কখনো জেরিন, মুকুল, বিউটি, শম্পাও থাকত।

আমার প্রিয় শিক্ষক ভীষ্মদেব চৌধুরীর রুমটা শুধু খোলা। ভেতরে আলো জ্বলছে। একজন নারী ঢুকলেন। হয়তো উনি শিক্ষক হবেন। সেমিনার কক্ষে দ্রুত ঢুকে ঝটপট রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়ে খাবার আর উপহারের টোকেন নিয়ে বেরিয়ে আসি।

সিিঁড় মাড়িয়ে নেমে এলাম কলাভবনের সামনের ছোটো মাঠের কাছে। সেখানে এখন ইট সাজিয়ে ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। অপরাজেয় বাংলার নিচে কিছু ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার চোখেমুখে কী এক দ্যুতি! কৌতূহল আর উদ্দীপনা ওদের কথাবার্তায়। দেখে মনটা ভালো হয়ে গেল।

 

ঘাসের ওপর পড়ে থাকা মরাপাতা মাড়িয়ে হাঁটতে থাকি, টিএসসির দিকে...

 

আমার এমন কেন হয়?

যখনই ক্যাম্পাসে আসি বিদায়ের সময় বারবার পেছনে তাকাই। মনে হয় কেউ আমাকে পেছন থেকে দেখছে। যতবারই পেছনে তাকাই মনে হয় ঠিক তখনি কেউ একজন আড়ালে লুকিয়ে গেল।

হালকা বেগুনি রঙের লিপস্টিক, কোমর ছুঁইছুঁই চুল, উজ্জ্বল শ্যামলা বরণ, চোখের ভেতর এক সমুদ্র মায়া। মুখখানি আবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

আকাশের দিকে তাকালাম। মেঘের ফাঁকেফাঁকে শেষ বিকেলের বিদায়ী সূর্যের কিছুটা আলো খেলা করছে। মেঘের ভেতর সেই মুখখানি খুঁজি। উঁচু একটা গাছ থেকে ঝরাপাতা মুখে এসে পড়ল।

দু’হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে হাঁটতে থাকি, টিএসসির সড়ক মোহনার দিকে...

এখনো কি কেউ আমাকে আড়ালে লুকিয়ে দেখছে?