আমাদের সাংঘাতিক ভাই

 

আয়েশ করে টঙে বসে বন্ধুদের সঙ্গে চা খাচ্ছি। এমন সময় রাকিব ছুটে এসে জানাল সাংঘাতিক ভাই আসছে। শুনে বন্ধুদের অনেকেই হাসিতে ফেটে পড়ল। আসিফ তো গরম চায়ে জিভ পুড়িয়েও হো-হো করে হাসতে থাকল। কেবল আমি আর পিয়াল মুখ গম্ভীর করে বসে রইলাম। যাকে সাংঘাতিক ভাই বলে সবাই চেনে, তিনি আসলে পেশায় একজন সাংবাদিক। এলাকার সিনিয়র ভাই, কামরান হুদা। আদর করে অনেকেই আবার নামটা শর্ট করে ‘কাহু’ ডাকে। আমরা অবশ্য ‘ভাই’ বলেই সম্বোধন করি। সামনে কামরান ভাই, আড়ালে আবডালে সাংঘাতিক ভাই।

কামরান ভাইয়ের পেশাজীবন বড়ই অদ্ভুত। ক্যারিয়ারের শুরুতে জাতীয় পত্রিকায় জেলা প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করলেও দু-তিন বছর পর অনলাইনভিত্তিক নিউজ পোর্টালে পারমানেন্টলি কাজ শুরু করেন। জাতীয় দৈনিকে থাকতে অবশ্য খুব বেশি কায়দা করতে পারেননি। তবে সেসময়ে তার জনপ্রিয় সংবাদটি ছিল এলাকার রোমিও মুরাদ টাকলার বিয়ের ওপর, শিরোনাম ছিল ‘প্রেমের টানে প্রেমিকার বাড়িতে মিয়ানমারের যুবতী’। পরে সেই রোমিও মুরাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে জড়ানোর পর কামরান ভাই ক্ষেপে গিয়ে নিউজ করেন ‘রোহিঙ্গাকে বিয়ে করলেন মুরাদ টাকলা’। ব্যস! মুরাদ টাকলা ডিরেক্ট মানহানির মামলা করে বসলেন কামরান ভাইয়ের নামে। সাধের চাকরিটা হারালেন আমাদের কামরান ভাই। বেকার হয়ে বসে রইলেন প্রায় মাস তিনেক।

চাকরি হারানোর সেই সময়টাতে কামরান ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের সখ্যতা গড়ে ওঠে। আমরা ভবঘুরের মতো ঘুরতাম, আড্ডা দিতাম। সঙ্গী হিসাবে তিনি এসে ভিড়লেন আমাদের মাঝে। কাজ খুঁজে দেওয়ার জন্য প্রায়ই কাকুতি-মিনতি করতেন। নিজেরা বেকার হলেও আমরা তখন চেষ্টা করেছি কামরান ভাইকে কাজ জুটিয়ে দেওয়ার। একবার তাকে নিয়ে আমি দূর সম্পর্কের এক চাচার কাছে গেলাম। চাচার নিজস্ব প্রেস ব্যবসা আছে। আমি চাচাকে তার পরিচয় জানাতে বললাম, ‘আসসালামু আলাইকুম চাচা। আমি ওনার কথাই বলেছিলাম আপনাকে। বেশ ভালো লোক। কামরান হুদা।’

‘কামরান হুদা। মানে হুদাই কামরায়!’ বলেই হো-হো আওয়াজ তুলে খুব করে হেসে নিলেন চাচা। তার নিজস্ব একটা লোকাল পত্রিকা আছে, সেখানে চাকরি দিলেন কামরান ভাইকে। কিন্তু পরে শুনি দেড় মাসও টিকতে পারেনি সেখানে। কারণ প্রায় প্রতিদিনই অসংখ্যবার চাচা তাকে নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন আর বলতেন, ‘এ হচ্ছে কামরান হুদা। মানে হুদাই কামরায়!’ এটা বলেও ক্ষান্ত হতেন না চাচা। চারপাশ মাথায় তুলে হাসতেন আর গড়াগড়ি খেতেন। চাচার কাছে বিষয়টা হাস্যরসাত্মক হলেও কামরান ভাইয়ের জন্য খুবই অপমানের ছিল বিষয়টা। তিনি চাকরি ছেড়ে আরো কিছুদিন বেকার বসে থাকার পর অনলাইন নিউজ পোর্টালে কাজ শুরু করেন।

প্রচুর স্ট্রাগল করার পর অনলাইন নিউজ পোর্টালে পারমানেন্টলি কাজ পাওয়াটা সৌভাগ্যের হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কামরান ভাইয়ের বেলায় হলো তার উল্টো। অনলাইন সাংবাদিকতায় আসার পর তিনি যে ধরনের নিউজ করা শুরু করলেন, তা আর দশজনের সামনে উপস্থাপন করা যায় না। ‘এ কী করলেন অমুক’ ধরনের সংবাদ লেখা শুরু করলেন। তাজ্জবের বিষয় হলো তিনি এগুলো লিখেই হিট। অনলাইন নিউজ জগতে কামরান ভাইয়ের ডিমান্ড তুঙ্গে পৌঁছে গেল। আর আমাদের সার্কেলে তিনি সাংবাদিক থেকে সাংঘাতিক খেতাবে ভূষিত হলেন।

সেই কামরান ভাই আজ বহুদিন পর আমাদের চায়ের আড্ডায় এসে যোগ দিলেন। আমরা তো মহাখুশি। অন্তত চা-বিস্কুটের বিল দেওয়া লাগবে না। তবে আজকে আমাদের মাঝে কামরান ভাই আসার আরো একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। কিছুদিন আগে পিয়াল এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ+ পেয়েছে। ভাইয়ের কাছে আমরা জোর দাবি জানিয়েছিলাম এই আনন্দ সংবাদটি যেন নিউজ আকারে প্রকাশ করেন। ভাই আমাদের দাবি রেখেছেন। এসেই জানালেন পিয়ালের নিউজ করে দিয়েছেন। আমরা তড়িঘড়ি করে ভাইয়ের বলা নিউজ পোর্টালে ঢুকলাম। কিন্তু নিউজটার শিরোনাম দেখেই বুকের খাঁচা থেকে জানপাখি বেরিয়ে যাওয়ার দশা হলো। পিয়াল তখনো দেখেনি। জিজ্ঞেস করল, ‘কী লিখেছে ভাই?’ আমরা কোনোরকম কেবল শিরোনামটাই বলতে পারলাম, ‘দেখুন এক তরুণের আত্মকাহিনি : নেশাখোর পেল গোল্ডেন এ+’!