ঘটনাটি জুলাই ২০০৯ সালের দিকে। আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ছি। সে বছর আকস্মিক তীব্র পাহাড়ি ঢলে গ্রামের সব কিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেল। রাস্তা ভেঙে গিয়েছে। দোকানপাটে বন্যার পানি ঢুকে সব মনিহারি দ্রব্য ভিজে একাকার। যাদের কাচা ঘরবাড়ি আছে তাদের দুঃখ আরো ভীষণ ভয়াবহ। বন্যার দু-একদিন পর জরুরি ত্রাণের বিকল্প হিসেবে হঠাত্ একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার খাদ্য কর্মসূচির গাড়ি এলো তাদের উচ্চমানের ভিটামিনযুক্ত বিস্কুট আর বিশুদ্ধ মিনারেলযুক্ত পানির বোতল নিয়ে। এটা দেখে বিশেষ করে আমরা ছোটরা কী যে খুশি হয়েছি, তা বলার মতো না। একসময় ওই সংস্থা কর্মকর্তারা বিস্কুটের প্যাকেটগুলো স্থানীয় জনগণকে দেওয়ার জন্য গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। কিন্তু সমস্যাটা হলো তারা যাওয়ার পর ইউনিয়ন পরিষদের কর্মকর্তারা তা দিতে গড়িমসি করতে শুরু করল। বিস্কুটের কথা শুনে আশপাশের বন্যা কবলিত গ্রাম থেকে মানুষজন এসে ইউনিয়ন পরিষদের বাইরে জমতে শুরু করল। ইউনিয়ন পরিষদের রুমের ভিতরে বিস্কুটগুলোকে সতর্ক পাহারায় রাখল কর্মকর্তারা। যাতে কেউ নিয়ে না যায়, এই ভয়ে। বড়োদের পাশাপাশি আমরা মানে ছোটদের জমায়েতও হতে লাগল। বড়োরা শান্ত থাকলেও বিস্কুটের লোভে ছোটরা এর মধ্যে হইচই শুরু করে দিয়েছে। যেভাবেই হোক তাদের বিস্কুট চাই চাই-ই। ওদিকে পরিষদের কর্মকর্তারাও নাছোড়বান্দা। আর আমরাও হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নই। আমরা মনে মনে ধরেই নিয়েছি এই বিস্কুটগুলো আমাদের প্রাপ্য। এগুলোতে আমাদের অধিকার আছে। কেউ বঞ্চিত করতে পারবে না আমাদের সেই অধিকার থেকে। আমরা বিভিন্ন ভাবে কুবুদ্ধি আঁটতে লাগলাম বিস্কুটগুলো তাদের কব্জা থেকে বের করার জন্য। হঠাত্ ছোটদের মধ্যে কেউ একজন বলল, ‘পরিষদের পেছনে একটা জানালা আছে যেটা ভাঙা। ওটা দিয়ে একটু কারিকুরি করলেই বিস্কুট নিয়ে পগার পার হওয়া যাবে।’ সাথে সাথে দলের দু-একজন গিয়ে মিশন শুরু করে দিল। আমরা থাকলাম সতর্ক পাহারায়। যাতে কেউ না দেখে। ওদিকে গ্রামের অন্য ছোটরাও পরিষদের পেছনে গিয়ে জড়ো হতে লাগল। কেউ একজন ভাঙা জানালাটাকে আলতো করে খুলে হাত ঢুকিয়ে রুমে সারিবদ্ধ করে রাখা বিস্কুটের বক্সকে ব্লেড দিয়ে এমনভাবে কাটল যাতে সব বিস্কুট নেওয়া যায়। এভাবে করতে করতে বিস্কুটের বেশ কয়েকটি প্যাকেট মুহূর্তের মধ্যেই খালি হয়ে গেল। একসময় কথাটি চলে গেল পরিষদের কর্মকর্তা আর গ্রাম্য পুলিশের কানে। তারা হাতে লাটি নিয়ে তেড়ে আসতে দেখেই আমরা যে যতটুকু পারলাম বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে দিলাম ভোঁ-দৌড়। তাদের নাগালের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম গাছের আড়ালে। দেখলাম আমাদের সমবয়সী একজন তার পরনের লুঙ্গির মধ্যে অনেক বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বেচারা দৌড়াতেও পারছে না। লুঙ্গি সামলাবে না কি বিস্কুট সামলাবে। এদিকে গ্রাম্য পুলিশরা লাঠি হাতে তার পিছু নিয়েছে। বিস্কুটের ভারে তার লুঙ্গি খুলে খুলে অবস্থা। এমন সময় এক গ্রাম্য পুলিশ তাকে ধরতে যাবে ঠিক তখনই বিস্কুটসহ তার পরনের লুঙ্গিটা গেল খুলে। সে সবকিছুর মায়া ত্যাগ করে পাশের ডোবায় দিল ঝাঁপ। তার অদ্ভুত কাণ্ড দেখে সবার সে কী হাসি! কিছুক্ষণ পর দেখি বেচারা অন্য পাড়ে গিয়ে খাবি খাওয়া মাছের মতো করে আমাদের সাহায্য চাচ্ছে। আমরা তাকে একটি শার্ট দিলাম তার লজ্জা নিবারণের জন্য। বেচারা সে যাত্রায় রক্ষা পেল। তবে পরের কয়েক দিন সে ওই ঘটনার রেশ ধরে আমাদের সামনে আসেনি। যদি আবার আমরা তাকে ক্ষেপাই এই ভয়ে।
কক্সবাজার সরকারি কলেজ