হত্যা, ধর্ষণ, বয়স ও লিঙ্গ নির্ণয়, ডিএনএ টেস্ট—প্রভৃতি কাজে একটি মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। এইসব ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে ফরেনসিক রিপোর্ট বা ময়নাতদন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে কাজ করে। অনেক সময় এই রিপোর্টের উপর নির্ভর করিয়াই প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করা হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আদালতে সঠিকভাবে দাখিল না করিলে সেই বিচার বিঘ্নিত হইয়া থাকে। ন্যায়বিচারের জন্য এমন একটি অপরিহার্য বিভাগ আজ সবচাইতে অবহেলিত। বিশেষত দেশে সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলিতে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের চরম সংকট চলিতেছে। এই মুহূর্তে ৩৬টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল রহিয়াছে। প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে কমপক্ষে পাঁচ জন করিয়া ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ থাকিবার কথা। এই হিসাবে ৩৬টি মেডিক্যাল কলেজে কমপক্ষে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ থাকার কথা ১৮০ জন। অথচ সব মিলাইয়া মাত্র ২৭ জন বিশেষজ্ঞ ফরেনসিক রহিয়াছেন। এই সংখ্যক ফরেনসিক দ্বারা সারাদেশে প্রতিদিন ঘটিয়া যাওয়া হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, বয়স ও লিঙ্গ নির্ণয় করা অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছে। এইজন্য অনেক ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ে যেইখানে মেডিক্যাল কলেজ নাই, সেইখানে সাধারণ একজন এমবিবিএস চিকিত্সক দিয়া ময়নাতদন্ত ও ধর্ষণসংক্রান্ত মামলার আলামতের পরীক্ষা করা হয়। এই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ সংকট থাকায় এই নিয়া চরম ঝামেলা ও দুর্ভোগে পড়িতে হইতেছে বিচারপ্রার্থী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
মূলত নব্বইয়ের দশক হইতে এই বিভাগ চরম অবহেলার শিকার। বিশেষজ্ঞ সংকটের কারণে দেশ জুড়িয়া আলোচিত অনেক হত্যাকাণ্ডের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট নিয়া জনমনে সন্দেহ, উদ্বেগ ও বিতর্কের সৃষ্টি হইতেছে। এমনকি অনেক হত্যাকাণ্ড ময়নাদতন্তের ভুলের কারণে আত্মহত্যায় পরিণত হইতেছে। একটু গভীরে বিশ্লেষণ করিলে দেখা যাইবে, এই জনবল সংকটের আসল কারণ হইল এই চিকিত্সা শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের এক ধরনের অনীহা রহিয়াছে। ইহার কারণ, বিভিন্ন আদালতে গিয়া সাক্ষী দেওয়া নিয়া ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের পদে পদে ভোগান্তির শিকার হইতে হয়। এই সাক্ষীর কারণে তাহাদের একাডেমিক কাজসহ নানা সমস্যায় পড়িতে হয়। সিনিয়রদের নিকট নানা ধরনের ঝুঁকির কথা শুনিয়াই নূতন করিয়া এমবিবিএস পাশ করা ডাক্তাররা উচ্চপর্যায়ে আসিয়া ফরেনসিক মেডিসিন বিষয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট করিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। ফলে এই বিভাগে সর্বসাকল্যে এক হইতে দুই জন শিক্ষার্থী উচ্চতর কোর্সে ভর্তি হন। জানামতে, শুধু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আট হইতে ১০টি ময়নাতদন্ত হয়। এই হিসাবে দেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে গড়ে দিনে ১৫০টি ময়নাতদন্ত হয়; কিন্তু বিশেষজ্ঞ সংকটের কারণে অনেক পরীক্ষা গুরুত্ব দিয়া করা যাইতেছে না। সুতরাং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের শূন্য পদগুলি অবিলম্বে পূরণ করিতে হইবে। এই সংক্রান্ত চিকিত্সা শিক্ষার উন্নতিবিধান জরুরি। এইজন্য এই পেশায় যাহারা আছেন তাহাদের নানাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।