বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশের তালিকায় চীন ও ভারতের পরে বাংলাদেশের অবস্থান। অন্যদিকে বড়ো শহরগুলোর মধ্যে দূষণের দিক দিয়ে বিশ্বে রাজধানী ঢাকার অবস্থান তৃতীয়। ইন্টারন্যাশনাল গ্লোবাল বার্ডেন ডিজিজ প্রজেক্টের প্রতিবেদনের মতে—বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর ক্ষেত্রে বায়ুদূষণকে চার নম্বরে দেখানো হয়েছে। আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন হাসপাতালে বায়ু সংক্রামিত রোগের কারণে ১ দশমিক ৪ লাখ লোক মৃত্যুবরণ করে থাকে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পৃথিবীতে ৪২ লাখ লোক মারা যায় বহিঃ বায়ুদূষণের কারণে, ৩৮ লাখ মারা যায় চুল্লির বায়ুদূষণের কারণে এবং সমগ্র পৃথিবীর ৯১ শতাংশ লোক দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে। ভারতের এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সাম্প্রতিককালে প্রায় ২২ লাখ লোক বায়ুদূষণের কারণে ফুসফুস রোগে আক্রান্ত। যার শতকরা ৫০ ভাগ শিশু। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকরী ও জনসচেতনতা না বাড়ালে অদূর ভবিষ্যতে ভয়াবহ বায়ুদূষণে পড়বে বাংলাদেশ।
বায়ুর গুণমান নির্ণয়ের জন্য বিশ্বব্যাপী এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) নামে পরিচিত, যার প্রেক্ষিতে শ্বাসপ্রশ্বাস কতটুকু নিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ অর্থাত্ স্বাস্থ্যের জন্য কতটুকু ক্ষতিকর, তা স্পষ্টভাবে অনুমেয়। পরিমাপ যদি ০-৫০ হয় তাহলে ভালো, আর যদি ৫১-১০০ হয় তাহলে সন্তোষজনক, যদি ১০১-১৫০ হয় তাহলে সাবধানতা, ১৫১-২০০ হলে অস্বাস্থ্যকর, যদি ২০১-৩০০ হয় তাহলে খুবই অস্বাস্থ্যকর এবং যদি ৩০১-৫০০ হয় তাহলে ভয়ংকর। ঢাকায় কিছুদিন আগের হিসেব অনুযায়ী এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স হচ্ছে ২৪৫। উপরন্তু ঢাকার বাতাসে ক্যাডমিয়াম প্রায় ২০০ গুণ বেশি, নিকেল ও সিসার মাত্রা প্রায় দ্বিগুণ ও ক্রোমিয়াম প্রায় তিন গুণের বেশি। পরিসংখ্যান হতে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে—বাতাসে দূষণের পরিমাণ কত ভয়াবহ। যা খুবই অস্বাস্থ্যকর। দূষিত বায়ুর পরিমাপ করা হয় পাঁচটি বিষয় বিবেচনায় যেমন—বাতাসে কী পরিমাণ ও আকৃতির কণা (Particulate Matter PM 2.5 এবং PM 10) বিদ্যমান, নাইট্রাস অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড এবং ওজোনের ওপর। এক্ষেত্রে PM 2.5 অর্থাত্ প্রতি ঘনমিটারে ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটারের আকৃতির কণা যদি ৩৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হয়, তা স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর।
পরিবেশ অধিদপ্তরের এক গবেষণা থেকে জানা যায় যে, ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা দায়ী ৫৮ শতাংশ, ডাস্ট ও সয়েল ডাস্ট ১৮ শতাংশ, যানবাহন ১০ শতাংশ, বায়োমাস পোড়ানো ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য উত্স ৬ শতাংশ দায়ী। দূষিত বায়ুর কারণে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এ থেকে ক্যানসার হতে পারে, যা মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইটভাটা থেকে নাইট্রোজেন অক্সাইড ও সালফার ডাইঅক্সাইড অ্যাজমা, হাঁপানি, অ্যালার্জি সমস্যা, নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বাড়িয়ে দেয়। বালুকণার মাধ্যমে ফুসফুসে ‘স্লিকোসিস’ নামে রোগ সৃষ্টি হয়, যা ফুসফুসকে শক্ত করে দেয়।
কক্ষের অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণের কারণসমূহ :কক্ষের অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণ বিশেষ করে এয়ারকন্ডিশন কক্ষের বায়ুর দূষণ বাহিরের বায়ুর চেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০০ গুণ হয়ে থাকে। এক জন সুস্থ লোক শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ২ লাখ লিটার দূষিত বায়ু গ্রহণ করে থাকে। যার শতকরা ৯০ ভাগ কক্ষের অভ্যন্তরীণ দূষিত বায়ু। একটু লক্ষ করলে দেখতে পারবেন যে, আপনার প্রিয় জিনিসপত্র বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। যেমন— (১) এয়ারকুলার। (২) প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেশন ব্যতীত ঘরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রকার ফুল গাছ চাষাবাদকরণ, যা অক্সিজেনের মাত্রা হ্রাস করে থাকে। (৩) পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য: পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান থাকে (VOC), যার কারণে এলার্জি, অ্যাজমা হয়ে থাকে। (৪) বাথরুম যথাযথভাবে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। (৫) এয়ারফ্যেসনার/ এরোসোল (৬) সংরক্ষিত ফল-ফুল। (৭) তেলাপোকা এ ক্ষেত্রে স্প্রের পরিবর্তে Roach baits ব্যবহার করা যেতে পারে। (৮) স্যানিটারি ও এয়ারকন্ডিশনের লিকেজ হতে মারাত্মক বায়ুদূষণ হতে পারে। (৯) রান্নাঘরের আবর্জনা হতেও বায়ুদূষণ হতে পারে। (১০) গৃহপালিত কুকুর রোগ বহন করে থাকে। (১১) কাপড়ের সোফা পোলেন ও অ্যালার্জিও জীবাণু বহন করে। (১২) জীবাণু এবং বায়ুদূষণের অন্যতম উপাদান হচ্ছে কার্পেট।
হাসপাতালসমূহের বায়ুদূষণের কারণসমূহ :দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশের শতকরা ৯০-৯৫ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহের রোগীদের বায়ুদূষণের মাধ্যমে সংক্রমিত না হওয়ার কোনো ব্যবস্থা নাই। এমনকি অস্ত্রোপচার কক্ষ ও আইসোলেশন কক্ষসমূহের মতো স্পর্শকাতর কক্ষসমূহের বায়ুদূষণ মুক্ত করার কোনো ব্যবস্থা নাই। সাধারণ মানের স্প্লিট টাইপ এয়ারকুলার স্থাপন করে কার্য পরিচালনা করা হচ্ছে। রোগীদের মাধ্যমে বাতাসে মিশে থাকে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস প্রভৃতি জীবাণু। যা একমাত্র হেল্থ কেয়ার এইচ.ভি.এসির (Health Care-HVAC) পদ্ধতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা বহুলাংশে সম্ভব। পুরাতন বিদ্যমান হাসপাতালসমূহে হেল্থ কেয়ার এইচ.ভি.এসির পদ্ধতি স্থাপন করা সম্ভব নয় বিধায় প্রোটোবল এয়ার পিউরিফায়ার স্থাপনের মাধ্যমে বায়ুদূষণ বহুলাংশে হ্রাস করা যেতে পারে।
এ পর্যায়ে বহিরাঙ্গনের বায়ুদূষণ প্রতিরোধের জন্য প্রচলিত আইনের প্রয়োগ জোরদার করা যেতে পারে। সনাতন পদ্ধতির ইটভাটাগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ইটভাটায় রূপান্তর করা গেলে ৭০-৮০% দূষণ কমানো সম্ভব। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন বন্ধকরণ, রাস্তা নিয়মিত পরিষ্কারকরণ, পানি ছিটানো, নির্মাণ কাজ চলাকালে পানি ছিটানো এবং নির্মাণসামগ্রী আচ্ছাদন দ্ধারা আবৃতকরণ, কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ। অভ্যন্তরীণ কক্ষের বায়ুদূষণের প্রতিরোধের জন্য প্রোটোবল এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে, নিয়মিত ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দ্ধারা পরিষ্কার করা হলে বায়ুদূষণের মাত্রা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
রোগ মুক্ত হওয়ার স্থানসমূহে রোগী যাতে আরো রোগাক্রান্ত না হয় সে জন্য হাসপাতালসমূহে বায়ুবাহিত রোগ সংক্রমণের অন্যতম দূষিত বায়ু বন্ধের জন্য উন্নত বিশ্বের ন্যায় হেল্থ কেয়ার এইচ.ভি.এসির পদ্ধতি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। শুধু কুলিং এয়ার নয় ‘কোয়ালিটি এয়ার’ চাহিদা হওয়া প্রয়োজন।
n লেখক :তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী গণপূর্ত ই/এম সার্কেল, চট্টগ্রাম