বিপথে গেলে কাউকে ছাড়ব না

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিপথে গেলে সে যে-ই হোক আমি তাদের ছাড়ব না। সন্ত্রাস, মাদক, দুর্নীতিতে জড়িতদের প্রতি কোনো সহানুভূতি থাকবে না। আর নেতৃত্বে আসতে হলে ত্যাগের মনোভাব থাকতে হবে। ভাবমূর্তি সংকটে থাকা যুবলীগ নেতাদের বঙ্গবন্ধুর নীতি ও ত্যাগের আদর্শ নিয়ে নিজেদেরকে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানও অব্যাহত থাকবে।

গতকাল শনিবার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী যুবলীগের সপ্তম জাতীয় কংগ্রেসের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সারাদেশ থেকে আসা যুবলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, সবসময় সবাইকে মনে রাখতে হবে সততাই সবচেয়ে বড়ো শক্তি। একটা দেশ গড়ে তুলতে হলে সবচেয়ে বড়ো প্রয়োজন আমাদের যুব সমাজের মেধা, তাদের শক্তি, তাদের মননকে কাজে লাগানো। আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে—ভোগে নয়, ত্যাগেই হচ্ছে মহত্ত্ব। কী পেলাম, কী পেলাম না, সে চিন্তা নয়; মানুষকে কতটুকু দিতে পারলাম, কতটুকু মানুষের জন্য করতে পারলাম—সেটাই হবে রাজনীতিবিদের চিন্তা-ভাবনা। একজন রাজনীতিবিদ যে হবে, তার জীবনে ত্যাগ ও মানুষের কল্যাণের আদর্শ থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী যুবলীগ নেতাদের ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষিত করার পাশাপাশি বিপথে গেলে তার কঠোর অবস্থানের কথাও সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে বিগত সরকারগুলোর দুর্নীতিকে নীতি হিসেবে গ্রহণ, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-দুর্নীতির অভয়ারণ্য সৃষ্টি, বর্তমান সরকারকে বিপদে ফেলতে মিথ্যা দুর্নীতির ষড়যন্ত্রসহ বিএনপি-জামায়াত জোটের অপশাসন-দুঃশাসনের কথাও দেশবাসীকে স্মরণ করিয়ে দেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে যুবলীগ নেতাকর্মীদের ভূমিকা ও আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আদর্শ নিয়ে চলতে হবে। 

ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনা এবং জমকালো আয়োজনে যুবলীগের সপ্তম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর আদলে গড়ে তোলা দৃষ্টিনন্দন সুবিশাল মঞ্চে বেলা ১১টায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রথমেই জাতীয় সঙ্গীতের তালে তালে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় সংগঠনের পতাকা উত্তোলন করেন যুবলীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক চয়ন ইসলাম। এরপর শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর প্রধানমন্ত্রীকে প্রস্তুতি কমিটির পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয় এবং তাকে ক্রেস্ট উপহার ও উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া হয়। যুবলীগের প্রকাশনা প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন চয়ন ইসলাম ও হারুনুর রশীদ। এরপরই মূল মঞ্চের পাশেই নির্মিত মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বিশিষ্ট শিল্পী আনজুম মাসুদের পরিচালনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

প্রধানমন্ত্রী লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে একজন রাজনীতিক কীভাবে আদর্শ নিয়ে চলতে পারেন, তা জানার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং জাতির পিতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা যেসব প্রতিবেদন তৈরি করেছিল, তা নিয়ে করা প্রকাশনাগুলো পড়ার জন্য যুবলীগের নেতাকর্মীদের পরামর্শ দেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তারা দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে পারেনি মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কেন পারলাম? কারণ আমরা আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করেছি বলেই পেরেছি। 

মাদক, সন্ত্রাস, দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ সময় পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ সততার সঙ্গে মোকাবিলার বিষয়টিও যুবলীগের জাতীয় কংগ্রেসে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমাদের ওপর অনেকে বদনাম দিতে চেয়েছিল। এক পদ্মা সেতু নিয়ে যখন অভিযোগ এনেছিল বিশ্বব্যাংক, তখন আমি চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলাম। বিশ্বব্যাংক কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নোবেল বিজয়ী গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে নিয়ে বলেন, দেখা গেল একটা ব্যাংকের এমডির পদ ছাড়তে পারে না, এদিকে নোবেল প্রাইজ পায়। অথচ একটা ব্যাংকের এমডির পদ ছাড়েন না। সেই পদ কেন বয়সের কারণে ছাড়তে হল, সেই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করার জন্য আমেরিকায় গিয়ে ধরনা দিল। 

খালেদা জিয়াসহ তার পরিবারের বল্গাহীন দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এই ধরনের একজন নিকৃষ্ট (খালেদা জিয়া), যিনি ক্ষমতায় থাকতে গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের আইভী রহমানসহ ২২ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। একবার না বারবার চেষ্টা করেছে হত্যাকাণ্ড চালাতে। যারা অস্ত্র দিয়ে, অর্থ দিয়ে এ দেশের সমাজকে ধ্বংস করেছে। যার ছেলে (তারেক রহমান) ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ষড়যন্ত্রে জড়িত বলে সাজাপ্রাপ্ত, মানিলন্ডারিং মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। তাদের (খালেদা জিয়া) সঙ্গে এই ধরনের আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের তুলনা এরা (বিএনপি) কোন মুখে করে, সেটাই আমার প্রশ্ন। 

প্রধানমন্ত্রী এ সময় দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আমরা দেশকে সবদিক থেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সমস্ত কর্মসূচিতে আছে একেবারে তৃণমূলের মানুষ। তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করেই আমরা তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। কাজেই সেভাবেই আমরা এ দেশকে গড়ে তুলতে চাই। সেখানে চলার পথে কেউ যদি বিপথে যায়, সে যে-ই হোক, আমি তাদের ছাড়ব না। কারণ, দিনরাত পরিশ্রম করি দেশের মানুষের জন্য। আর জাতির পিতা শুধু দেশকে স্বাধীন করে যাননি, মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য তিনি তার বুকের রক্ত দিয়ে গেছেন। এই কথাটা আমাদের মনে রাখতে হবে। কাজেই এই দেশ ব্যর্থ হতে পারে না। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, মাদক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক চয়ন ইসলামের সভাপতিত্বে প্রথমেই শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেলাল হোসাইন। স্বাগত বক্তব্য দেন অভ্যর্থনা উপ-কমিটির আহ্বায়ক যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী। সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট উপস্থাপনা করেন সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব ও বিদায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

শেখ হাসিনা পরবর্তী প্রজন্মের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করেন : ওবায়দুল কাদের

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা পরবর্তী প্রজন্মের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য কাজ করেন। দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সন্ত্রাস-দুর্নীতি, মাদক ও চাঁদাবাজি বিরোধী শুদ্ধি অভিযান সফল করতে হবে। শেখ হাসিনা নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি করেন না। তিনি পরবর্তী প্রজন্মের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য কাজ করেন। দেশে চলমান শুদ্ধি অভিযান সফল করতে যুবলীগের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যুবলীগের নেতাকর্মীদের কাছে আমি শুধু এই আহ্বান জানাব, নেত্রীর শুদ্ধি অভিযান আপনারা সফল করবেন। যুবলীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগের সধারণ সম্পাদক বলেন, মাদককে ‘না’ বলুন, সন্ত্রাসকে ‘না’ বলুন, দুর্নীতিকে ‘না’ বলুন, টেন্ডারবাজিকে ‘না’ বলুন, চাঁদাবাজিকে ‘না’ বলুন, ভূমিদস্যুতাকে ‘না’ বলুন।