দেশের কচুরিপানার ‘কফিন’ বিদেশে!

ভোর হলেই শফিক বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন দা, কুড়ালসহ নানা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে। আশেপাশের কয়েক গ্রামের বন-জঙ্গল ও পরিত্যক্ত জায়গাগুলো তার খুবই চেনা। হেলে পড়া ও নষ্ট হয়ে যাওয়া কলাগাছ, কলাগাছের শুকনা খোল সবই সংগ্রহ করেন দিনভর। পুকুর, খাল, বিল, নদী, নালা, ডোবার ভাসমান কচুরিপানাও সংগ্রহ করেন প্রয়োজন মতো।

তারপরের কাজও তিনি করেন। এসব পরিত্যক্ত ও অপ্রয়োজনীয় উপকরণগুলো নির্দিষ্ট মাপে কাটেন তিনি। এরপর রোদে শুকানো, প্রসেসিং করে রাখেন গুদামে। অর্ডার পেলেই ব্যাম্বু স্লিপস, ব্যাম্বু কোয়াটার লং, ব্যাম্বু কোয়াটার শর্ট, স্লাইডার ইত্যাদি বানিয়ে পাঠিয়ে দেন নীলফামারী উত্তরা ইপিজেডে। উত্তরা ইপিজেডে ওয়েসিস ট্রান্সফরমেশন লিমিটেড নামের শিল্প কারখানায় এসব কাঁচামাল থেকে তৈরি করা হয় কফিন। এসব উচ্চমূল্যে কফিন বিক্রি হয়ে থাকে ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে।

শফিকের মতো নীলফামারির প্রায় ২শ’ মানুষ এই কাজটি করেন। জল-জঙ্গলে, বন-বাদাড়ে ঘুরে এসব অপ্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের মাধ্যমেই তাদের সংসার চলে। এমনকি কাঁচামাল সংগ্রহের সুবিধার জন্য ২০১৩ সালে জেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়নের দূর্বাছড়ি গ্রামের শিশাতলীতে একটি শাখা প্রতিষ্ঠান খোলেন তারা। এর নাম ইকো সাপ্লাইজ।

২৫ কোটি টাকা আয়!

মানুষ মরণশীল, আর মানুষের মৃত্যু অনিবার্য। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় শবদেহ পৌঁছাতে প্রয়োজন হয় কফিনের। আর এই কফিন তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে পরিত্যক্ত কলার গাছ ও কচুরিপানা। যেখান থেকে বছরে ২৫ কোটি টাকা আয় করছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সালে মাত্র ১৫০ জন শ্রমিক নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এরপর ২০১৩ সালে কারখানার কাঁচামালের জন্য দূর্বাছুড়ি গ্রামের শাখাটি স্থাপন করেন। এখানকার শ্রমিকরা  কফিন তৈরির কাঁচামাল পরিত্যক্ত কলাগাছ, কচুরিপানা ও কলার খোসা সংগ্রহ করেন।

এই শাখায় প্রতিদিন ৪৬ জন নারী ও পুরুষ কাজ করেন। তাদের দৈনন্দিন মাথাপিছু মজুরি দেওয়া হয় ২৫০ টাকা।

লক্ষ্মীচাপ পূর্ব ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের কারখানা শ্রমিক সুধীর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আগে মানুষের বাড়িতে কাজ করে মজুরির টাকার জন্য বাজারে বসে থাকতে হতো। এখন এই কারখানায় কাজ করে টাকা ও কাজের কথা ভাবতে হয় না। প্রতিদিন বিকেলে মজুরির টাকা নিয়ে সময়মতো বাজার করে বাড়ি চলে যাই। এটা আমাদের জন্য অনেক ভালো।’

একই ইউনিয়নের কাছারিপাড়া গ্রামের সুনিল চন্দ্র হাজেরা বলেন, ‘আগত (আগে) কামের (কাজ) খুব অভাব ছিল। এই কোম্পানি হওয়ায় কাম নিয়ে ভাবির (ভাবা) লাগে না। এইডে (এখানে) হামার (আমার) মতো অনেক মাইনসে (লোক) কাম করে দিন চলায়ছে। হামার গ্রামোতে কাম করি এখন ভালো আছি।’

 

রাত পোহালেই কাজ শুরু

শ্রমিকরা রাত পোহালেই হাতে দা, কুড়াল, দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আশেপাশের কয়েকটি ইউনিয়নে গিয়ে গ্রামগঞ্জের ঝোঁপঝাড় থেকে হেলে পড়া কলাগাছের চোটা বা খোল ঢাকুনা সংগ্রহ করেন শ্রমিকরা। আর গ্রামের পুকুর, খাল-বিল, নদী-নালা, ডোবার ভাসমান কচুরিপানা ও বাঁশ সংগ্রহ করে শ্রমিকরা প্রতিদিন নিয়ে আসেন কারখানায়। সেখানে রক্ষিত হয় কাঁচামাল হিসেবে। সেগুলো নির্দিষ্ট পরিমাণে কেটে, রোদে শুকিয়ে, প্রসেসিং করে গুদামজাত করে রাখা হয়। সেগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে ব্যামু্ব স্লিপস, ব্যাম্বু কোয়াটার লং, ব্যাম্বু কোয়াটার শর্ট, স্লাইভার ও পোস্ট ইস্টিপস।

এই কাঁচামাল থেকে কফিন তৈরি করে বিদেশে রপ্তানির করা হয়। সেই কফিনগুলো বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, হল্যান্ডে রপ্তানি হয়ে থাকে।

 

পুঁজি অনেক কম

লক্ষ্মীচাপ শিশাতলীর অফিস ইনচার্জ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কফিন তৈরির জন্য পরিত্যক্ত কলাগাছ, কচুরিপানা, কাঞ্চন ফুল, কিছু বাঁশ সংগ্রহ করে থাকি। এসব সংগ্রহ করতে আমাদের তেমন অর্থ ব্যয় হয় না। শুধু বাঁশ ক্রয় করতে হয়।’ সাপ্লাই চেইন কমার্শিয়াল ম্যানেজার এলেন ফেইত ফুলেল বলেন, ‘আমরা বেকারের কর্মসংস্থান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা, পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য প্রতিষ্ঠানটি চালিয়ে যাচ্ছি।’

প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার ইভান্স হালদারের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘পরিত্যক্ত কলার গাছ, কচুরিপানা, বাঁশ ও ফুল থেকে প্রসেসিং করে কাঁচামাল সংগ্রহ করে কফিন তৈরি করে থাকি। কফিনগুলো বিদেশে রপ্তানি করা হয়।’

কফিন তৈরির সহজলভ্য উপকরণ ও সস্তা মজুরিতে দৃষ্টিনন্দন কফিন তৈরি করছেন নারী ও পুরুষরা। ফলে দৃশ্যপট পাল্টে গেছে এলাকার। এতে এলাকায় আশ্বিন-কার্তিকের মঙ্গা আর চোখে পড়ে না।