শুকনো মৌসুমের বিছনাকান্দি

যেন এক স্বর্গোদ্যান। স্বর্গের বিছানা বিছানো এক মনোরম স্থান। বাংলাদেশ-ভারতের ‘নো-ম্যান্স ল্যান্ড’-এ অবস্থিত এক অপরূপ পর্যটন স্পট। নাম বিছনাকান্দি। সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট ইউনিয়নের রুস্তমপুর ইউনিয়নের প্রান্তিক জনপদের এক আকর্ষণীয় স্থান। প্রতিদিনই এ স্থানের টানে দলে দলে ছুটছেন পর্যটরা। বিছনাকান্দি মানুষের অতৃপ্ত মনকে তৃপ্ততার আবেশে ভরিয়ে তোলে।

আম্বড়খানা পয়েন্ট থেকে আমাদের যাত্রা গোয়াইনঘাট উপজেলার হালদারপাড় বাজারের উদ্দেশ্যে। পথে যেতে যেতে মালিনীছড়া চা বাগান, সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর, সালুটিকর বাজার প্রভৃতি আকর্ষণীয় স্থান আমাদের মনকে আবিষ্ট করে। সকাল সাড়ে ১১টায় হালদারপাড় বাজারে পৌঁছে দেহ-মনকে খানিকটা চাঙা করতে স্থানীয় বিসমিল্লাহ হোটেলে সিঙ্গারা ও চা পান করি। এরপর হালদারপাড় বাজার থেকে উত্তর দিকে পায়ে হেঁটে রওনা হই স্বর্গের অপ্সরী বিছনাকান্দির পথে। হালদারপাড় বাজারেই পেয়ে যাই রাজমিস্ত্রি মো. আমিন উদ্দিনকে। তার বাড়ি সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। তিনি হাদারপাড় এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার সুবাধে এলাকার সবকিছু তার নখদর্পণে। তিনি জানালেন, বর্ষা মৌসুমে হালদারপাড় বাজার থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে বিছনাকান্দি যাওয়া যায়। ভাড়া নেয় জনপ্রতি মাত্র ২০ টাকা। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে কোনো যান না চলায় পায়ে হাঁটাই একমাত্র ভরসা।

যতই সামনে এগোতে থাকি ততই যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধতার আবেশ বাড়িয়ে তুলছিল। মায়াবি পিয়াইন নদীর নীল জলরাশি, ধান ক্ষেত, পাথরের পাহাড় সবকিছুই যেন অবিশ্বাস্য সৌন্দর্যের সমাহার। পুরো বিছনাকান্দির পথ এতটাই সৌন্দর্যময়, যা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। চারদিকে বিষ্ময়কর সৌন্দর্য। আমরা যত সামনে এগুতে থাকি ততই কাছাকাছি আসতে থাকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সুউচ্চ পর্বতমালা। এসব পর্বতের মাঝে হিমশীতল সৌন্দর্য আমাদের বিমোহিত করে।

দেড়ঘণ্টা পায়ে হাঁটার পর দুপুর দেড়টায় পৌঁছে যাই বাংলাদেশ-ভারতের ‘জিরো পয়েন্ট’ বিছনাকান্দিতে। বিছনাকান্দি পুরোটাই পাথরে ভরা। পিয়াইন নদীর পানি ও সমতলে যেদিকে দু-চোখ যায় শুধু পাথর আর পাথর। ছোট-বড় অসংখ্য পাথর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের অংশ থেকে ঝরনাধারার সঙ্গে গড়িয়ে নামছে বাংলাদেশের বিছনাকান্দি অংশে। এ এক মনোরম দৃশ্য। পিয়াইন নদীর বুক চিড়ে পাথর তুলে আনছেন পাথর শ্রমিকরা। একদিকে পাথর তোলা হচ্ছে মুহূর্তেই অন্যদিকে পাথর এসে ভরে যাচ্ছে স্থানটি। এছাড়া বড় বড় পাথরের ফাঁকে পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ নীল জলরাশি এবং শ্যাওলার আস্তরণ দেখে মনে হলো সাগরের তলদেশের প্রবাল। পাথর ছুঁইয়ে জল চলে যাচ্ছে পিয়াইন নদীর স্রোতে। সারাবছরই বিছনাকান্দি তার রূপের ঝলক দেখায়। সারাদিনের যান চড়া ও দেড়ঘণ্টার পায়ে হাঁটার ক্লান্তি দূর হয়ে যায় এক নিমিষেই। আমরা মুগ্ধ চিত্তে চারপাশ দেখার পর হঠাত্ ঝাঁপিয়ে পড়লাম পাথুরে পানিতে। শরীর এলিয়ে দেয় পাথর পানির অপরূপ বিছানায়। সবার চোখ-মুখে পরিপূর্ণ একটি ভ্রমণের পরিতৃপ্তি।