শরতের আয়ু ধীরে ধীরে কমে আসছে। হেমন্তের আগমনী বার্তা শহর থেকেই অনুভব করছিলাম। ঢাকায় অফিস ও অন্যান্য কাজের কারণে পূজার মাঝামাঝি সময়ে সস্ত্রীক বাড়ি রওনা হলাম। প্রতিবার ঢাকা থেকে বাড়িতে যাওয়ার সময় এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করে। এবারের পূজায় এই অনুভূতি আরো একধাপ ওপরে ছিল! প্রতিবার যাওয়ার সময় বাসস্ট্যান্ড থেকে খবরের কাগজ কিনি, না লাগলেও কিনি। বলা যেতে পারে এটা আমার অভ্যাস। আমরা যখন লঞ্চে করে পদ্মা নদী পাড়ি দিচ্ছি তখন আকাশের হতচ্ছাড়া রূপ আমাকে ক্ষাণিক উদাসী করে তোলে। হঠাত্ স্ত্রী নুপূরের স্বর, এই দেখ, পূজার ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার খবর। ইন্দ্রজাল থেকে বেরিয়ে বললাম, ঠিকই তো আছে, আমরাও তো পূজার ছুটিতে বেড়াতে যাচ্ছি, তাই না? নুপূর বললো, বাড়ি না কোনো বিশেষ জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার কথা বলছি। তাহলে তুমি বলো, বিশেষ কোথায় বেড়াতে যাওয়া যায়? হঠাত্ নুপূর বলে উঠল পেয়েছি!—কী পেয়েছো? বেড়াতে যাওয়ার বিশেষ জায়গা। আমাদের বাড়ির খুব কাছে। তুমি অনেকবার গেলেও আমি আজ পর্যন্ত যাইনি। আমার আর বুঝতে বাকি রইল না। রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি। প্রায় সাড়ে ৩শ’ বছরের পুরোনো জমিদার বাড়ি সঙ্গে একাধিক মন্দির, বিশাল উঁচু উঁচু মঠ। ভারি সুন্দর আর দৃষ্টিনন্দন জমিদার বাড়ির চারপাশ। মুহূর্তেই বলে ফেললাম চমত্কার! কালই যাব।
আমাদের বাড়ি থেকে রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ির দূরত্ব ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার হবে। বাড়িতে গেলে রিকশা বা অটোরিকশায় চড়ার থেকে মোটরসাইকেলে চড়তে বেশ ভালো লাগে। দুপুরে খেয়ে আমরা ৩ জন রওনা হলাম রাজা রুদ্র রায়ের বাড়ি।
শরতের বিকেল। দুই ধারে ঘন সবুজ বন। বিস্তীর্ণ মাঠে মধ্য বয়সের ধান গাছ মৃদু হাওয়ায় শরীর ছেড়ে দিয়েছে। এরমধ্যে সৌরভ বললো, দাদা এই পাশটা দেখেন। ছোট একটা সরু খালের ওপাশে সারিসারি নারিকেল গাছ। সবার বয়স প্রায় সমান। একটু এগিয়ে হাতের বামে মোড় ঘুরে বড় রাস্তার পাশ থেকে নেমে গেছে রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ির মন্দির এবং মঠের এলাকা। গাড়ির গতি কমিয়ে আমরা মন্দিরের রাস্তায় ঢুকে পড়লাম। শুরুতেই শতবর্ষের প্রকাণ্ড বটবৃক্ষের দেখা পেলাম। এরপর আমরা মূল মন্দিরের এলাকায় প্রবেশ করলাম। ডানপাশে সারিসারি বিশাল আকৃতির কারুকার্য খচিত মঠ। বামপাশে কেবল অবকাঠামোর অংশ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে প্রচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। আরো একটু এগিয়ে মূল কালিমন্দির। মন্দিরের ওপরে লেখা ‘সিদ্ধেশ্বরী কালিমন্দির’ মুঘল আমলে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনকালে প্রতিষ্ঠিত। এক সময় ভারত বিভাগের পূর্ব পর্যন্ত এখানে মহাধুমধামের সঙ্গে প্রত্যেক বাড়িতে দুর্গাপূজা হতো। রায়েরকাঠির রাজা রাজকুমার রায় দোলযাত্রা উপলক্ষে রায়েরকাঠিতে বিশাল মেলার আয়োজন করতেন।
মঠে বসবাসরত পাখিরা সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার আগে বেলা থাকতে থাকতে একবার এসে ঘুরে যায়। এরমধ্যে আমাদের সামনের মঠটিতে এক ঝাঁক গাঢ় সবুজ টিয়াপাখি এসে পড়ল! সঙ্গে তাদের নিজস্ব শব্দের বাক্য বিনিময়। আমরা সবাই মুগ্ধ হয়ে পাখিদের কোলাহল দেখছি। মন্দির এলাকার সব থেকে উঁচু মঠের ভেতরে স্থাপিত ২৫ মণ ওজনের বিশাল আকৃতির শ্বেতপাথরের শিবলিঙ্গ। কথিত আছে, উপমহাদেশের বিশাল আকৃতির শিবলিঙ্গের মধ্যে রায়েরকাঠি মঠের শিবলিঙ্গ অন্যতম। মন্দির ও মঠ থেকে রাজা রুদ্র রায়ের বাড়ি পায়ে হাঁটলে ৫ মিনিট! বাইরে থেকে পুরোনো দালানের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেলেও ভেতরে জনমানুষের বসতি রয়েছে। রয়েছেন রাজার বংশধররা। প্রবীণ এক ভদ্র লোকের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাত্ হয়। তিনি জানান, প্রায় সাড়ে ৩শ’ বছর আগে এখানে জমিদার বংশ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বার ভূঁইয়াদের অন্যতম মহারাজ কিংকর রায়ের বংশধর রুদ্রনারায়ণ স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে সুন্দবনের এই এলাকায় এসে বসতি স্থাপন করেন। এই রায় বংশ জঙ্গল কেটে আবাদ শুরু করে। ফলে তাদের নামানুসারে এর নাম রাখা হয় রায়েরকাঠি। এই জমিদার বাড়িতে নির্মিত হয় রাজভবন, অতিথিশালা, নাট্যশালাসহ অসংখ্য মন্দির।