ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের পথিকৃত, অহিংস ব্যক্তিত্ব ও ভারতবর্ষের জনপ্রিয় নেতা মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিবিজড়িত আত্রাইয়ের গান্ধী আশ্রমটি অনেকটাই সেজেগুঁজে এগুচ্ছে। নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে দিনদিন গান্ধী আশ্রমের কলেবর বেড়েই চলেছে। এরইমধ্যে ভারত সরকার এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের অর্থায়নে মহাত্মা গান্ধী ও পিসি রায় মেমোরিয়াল হল গড়ে উঠেছে। বর্তমানে আশ্রমের অনেকটা জায়গাজুড়ে চাষ করা হচ্ছে তুঁত গাছ। এছাড়াও জেলা পরিষদের অর্থায়নে সেখানে সীমানা প্রাচীর ও দৃষ্টিনন্দন গেট নির্মাণ করা হয়েছে। রয়েছে তুঁত গাছ। প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা দেখতে আসেন। শুধু তাই নয়, প্রতি সপ্তাহে একজন ডাক্তার এসে রোগী দেখেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আশ্রমটি আন্তর্জাতিক মানসম্মত পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের নির্যাতনের যাঁতাকলে যখন পিষ্ট ভারতবর্ষবাসী, তাদের জুলুম ও নিপীড়নে অতিষ্ট বিস্তীর্ণ জনপদের মানুষ, সেসময় ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের ডাক দিয়ে জনমনে জায়গা করে নেন ভারতবর্ষের কিংবদন্তী নেতা মহাত্মা গান্ধী। হিন্দু মুসলমানের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে থেকে তিনি এ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ইংরেজদের পণ্য বর্জন করে দেশীয় পণ্য ব্যবহারে জনমত সৃষ্টি করেন। তিনি এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ১৯২৫ সালে নওগাঁর আত্রাইয়ে এসেছিলেন। সেসময় তিনি আত্রাই রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন তেঁতুলিয়া নামক স্থানের আজকের এই গান্ধী আশ্রমে অবস্থান করে এলাকার অসহায় মানুষদের সহযোগিতা করেন। একইসঙ্গে এলাকাবাসীকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে তিনি এখানে খদ্দর কাপড় তৈরির তাঁত শিল্প স্থাপন ও খাঁটি সরিষার তেলের জন্য ঘানি স্থাপনসহ অনেক স্মৃতিচিহ্ন গড়ে তোলেন। তত্কালীন সময়ে বানভাসি মানুষদের সহযোগিতা করার লক্ষ্যে তিনি এখানে স্থাপন করেন বঙ্গীয় রিলিফ কমিটি।
গান্ধী আশ্রম দেখতে আসা শিক্ষার্থী তাবাসসুম, নিলীমা, রত্নাসহ অনেকেই জানায় মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিবিজড়িত গান্ধী আশ্রমটি খুব ভালো লেগেছে তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম, আব্দুল কুদ্দুসসহ অনেকেই জানায়, এখানকার অনেক জায়গা অবৈধভাবে দখল হয়ে আছে। সেই সব জায়গা উদ্ধার করে এখানে স্কুলের পাশাপাশি একটি হাসপাতাল স্থাপন করলে তারা এবং স্থানীয় গরিব-অসহায় মানুষ উপকৃত হবে। এছাড়াও এখানে যা বর্তমান আছে তা রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার প্রয়োজন। এখানে কিছু করার জন্য শুধুমাত্র কর্তাব্যক্তিদের সুদৃষ্টি ও সত্ মন মানসিকতার প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
গান্ধী আশ্রম কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. নিরঞ্জন কুমার দাস বলেন, ‘এক সময় গান্ধী আশ্রমের উন্নয়ন মুখ থুবরে পড়ে থাকলেও বর্তমানে গড়ে তোলা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন মহাত্মা গান্ধী ও পিসি রায় মেমোরিয়াল হল। এখানে প্রতিবছর আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হয় গান্ধীর জন্মোত্সব। আমি প্রতিদিন এই এলাকার গরিব ও অসহায় মানুষদের কষ্টের কথা চিন্তা করে বিনামূল্যে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে চিকিত্সা সেবা দিয়ে আসছি। তাই আশ্রমের আরো উন্নয়নের পাশাপাশি একটি হাসপাতাল গড়ে তোলা খুবই প্রয়োজন। আমি সরকার কিংবা উপজেলা প্রশাসন, এমনকি এই আশ্রম থেকেও কিছু পাই না। শুধু আমি নই, এই আশ্রমে ৩ বছর ধরে একজন কেয়ারটেকার দেখভাল করলেও তার কোনো বেতন-ভাতা কিংবা কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই।’
নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রাণীনগর) আসনের সংসদ সদস্য মো. ইসরাফিল আলম বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে এই ঐতিহাসিক আশ্রমটি খুবই অবহেলিত ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে আশ্রমটির মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি নিজে অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিভিন্ন দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের এখানে এনেছি। নিজস্ব অর্থায়ন এবং ভারত সরকারের সহায়তায় গান্ধী আশ্রমটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগানোর চেষ্টা করে আসছি। তবে এখনও এখানকার অনেক কাজ অসমাপ্ত রয়েছে। আমি আশ্রমটিকে আধুনিক, মানসম্মত ও আন্তর্জাতিকমানের পর্যটন কেন্দ্রে উন্নিত করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা রাখি আমি তাতে সফল হবো।’