অন্যরকম পাঠশালা

ভালো কিছু করার ইচ্ছে থাকলেই যে তা করা সম্ভব সেটা দেখিয়েছেন নীলফামারির সৈয়দপুর উপজেলার ডাংগারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শিবলি বেগম। মাত্র ২ বছরের মাথায় বদলে গেছে বিদ্যালয়টির শিক্ষার পরিবেশ। বেড়েছে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, হচ্ছে ভালো ফলাফল। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানো এবং প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ।

এখানে রয়েছে ১০ জনের ক্ষুদে চিকিত্সক দল এবং ১০ জনের কাব স্কাউট। নিয়মিত হয় অভিভাবক সমাবেশ, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির মিটিং এবং অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের জন্য করা হয় হোম ভিজিট। চালু রয়েছে মিড ডে মিল।

নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত, কবি সুফিয়া কালাম, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম ও পল্লীকবি জসিমউদ্দিনের নামে বিদ্যালয়ের একেকটি শ্রেণি কক্ষের নামকরণ করা হয়েছে। একটি কক্ষ রাখা হয়েছে নামাজের জন্য। ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে তৈরি করা হয়েছে শহীদ মিনার। সম্প্রতি এটির উদ্বোধন করেন সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম গোলাম কিবরিয়া।

জাতীয় পতাকায় আচ্ছ্বাদিত বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে সদ্য নির্মিত শহীদ মিনার। বিদ্যালয়ের দেয়ালে শোভা পেয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি। এছাড়া রয়েছে ভাষা শহীদের প্রতিকৃতি।

চিত্রায়িত হয়েছে জাতীয় ফুল, জাতীয় ফল, জাতীয় পাখি, বাংলা বর্ণের সমাহার প্রভৃতি। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের মাঝে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে লাইব্রেরি, সত্ মানসিকতা তৈরিতে সততা স্টোর, ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে স্টুডেন্ট কাউন্সিল এবং অনিয়মের ব্যাপারে স্থাপন করা হয়েছে অভিযোগ বাক্স। দেখা যায়, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলোও যেন শিক্ষক। সাজসজ্জা আর পরিপাটি সম্পন্ন দেয়ালে স্থান পেয়েছে শিক্ষাবিষয়ক দর্শনীয় উপকরণ। দেয়ালে তাকালেই যেন শিক্ষা গ্রহণ। রয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন। সুপেয় পানির জন্য নলকুপ এবং সীমানা প্রাচীর ঘেরা বাউন্ডারি। সর্বশেষ স্থাপন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কর্ণার। গত ১৪ নভেম্বর এটির উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক হাফিজুর রহমান চৌধুরী।

কর্ণারে দেশবিভাগ, মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছয় দফা, লাহোর প্রস্তাব, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, অস্থায়ী সরকার গঠন, ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ, বীরাঙ্গনা, সেক্টর কমান্ডার, জাতীয় ৪ নেতা, ভাষা শহীদ, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসর্মপণ, সৈয়দপুর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার চিত্র।

সৈয়দপুর উপজেলার বাঙালিপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মণপুর এলাকার ডাংগারহাটে ১৯৭২ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০১৩ সালে এটি জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে ৪ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছে এখানে আর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২৮ জন।

বাঙালিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রাণবেশ চন্দ্র বাগচি বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নে ১০টি স্কুল। এরমধ্যে ডাংগারহাট নতুন সরকারি বিদ্যালয় হিসেবে অনেক এগিয়ে রয়েছে। মানসম্মত শিক্ষা এবং শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতকরণে ভূমিকা পালন করছে বিশেষ। বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকটি আমাদের জাতীয় পতাকায় আচ্ছ্বাদিত। এটি সচরাচর চোখে পড়ে না। এটি শিশুদের মাঝে দেশপ্রেম তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।’

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আমিরুজ্জামান বকুল বলেন, ‘আমরা প্রতিমাসে বৈঠকে মিলিত হই। ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা করি। আর এটি সম্ভব হয়েছে বর্তমান প্রধান শিক্ষকের কারণে। একজন মানুষ বিদ্যালয়টি ঘুরে দেখলে শিক্ষা গ্রহণের জন্য যে পরিবেশ দরকার সেটি উপলব্ধি করতে পারবেন। কী নেই এখানে! অভিভাবক এবং মা সমাবেশ প্রায়ই হয়ে থাকে। শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়টি একটি উদাহরণ হতে পারে।’

প্রধান শিক্ষিকা শিবলি বেগম বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা শিক্ষা অফিস, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং শিক্ষকদের সহায়তায় এটি করতে পেরেছি। সর্বশেষ আমি শিক্ষার্থীদের মাঝে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ছড়িয়ে দিতে এবং মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত আমাদের যে অর্জন সেগুলো উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। স্লিপ এবং ক্ষুদ্র মেরামত বরাদ্দের টাকা আমি বিদ্যালয়ের কাজে ব্যবহার করেছি। যাতে শিক্ষার্থীদের এবং প্রতিষ্ঠানের কাজে আসে। কাজের শেষ নেই, তবে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে নান্দনিক একটি প্রতিষ্ঠান গড়তে পারবো।’

বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসক হাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘নিঃসন্দেহে ডাংগারহাট বিদ্যালয়টি আমাদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। একজন মানুষের ইচ্ছে থাকলেই যে করা যায় সেটি করে দেখিয়েছেন এখানকার প্রধান শিক্ষিকা। শিক্ষার্থীরা এখান থেকে উপলব্ধি করতে পারবে, শিখবে ও জানবে।’ জেলা প্রশাসন এ রকম উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে বলে জানায়।