কে না চাহে নিজেদের টিকাইয়া রাখিতে?

সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে একজন গবেষক বলিয়াছেন যে, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হইয়া দেখা দিতেছে। ইতিপূর্বে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলিয়াছেন যে, নির্যাতনের শিকার হইয়া পলায়ন করিয়া বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের ১১ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা নাগরিক শুধু বাংলাদেশের নহে, এই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।

প্রশ্ন হইল—রোহিঙ্গা সমস্যা কেন তৈরি হইল? যেই কারণে রোহিঙ্গারা আজ বিতাড়নের শিকার হইতেছে, তাহা কি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা? বিশ্বব্যাপী যেই অস্থিরতা ক্রমশ মাকড়সার জালের মতো ছড়াইয়া পড়িতেছে, বিশ্বের কোন্ দেশ ইহার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ অভিঘাত হইতে মুক্ত? এই নবতর অস্থিরতার সূত্রপাত ২০০১ সালের এগারোই সেপ্টেম্বরে। সেইদিন নিউ ইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে ভয়াবহ হামলার পর ‘সন্ত্রাস নির্মূলে’ বিশ্বব্যাপী শুরু হয় তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধ ক্রমশ ছড়াইয়া পড়িয়াছে বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশে। ইহার পাশাপাশি নাইন-ইলেভেনের ঘটনাটি দীর্ঘদিনের জাতিদ্বন্দ্বগত বহু রাষ্ট্রের অন্দরে ক্যাটালিস্টের মতো ভূমিকা পালন করে। আমরা দেখিতেছি ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব নব-নবরূপে এবং নূতন স্বীকৃতির মাধ্যমে আরো প্রতিষ্ঠা লাভ করিতেছে। একটি জাতিগোষ্ঠীকে তিলে তিলে শেষ করা হইতেছে স্লো পয়জনের মতো। সিরিয়া ইরাক লিবিয়ার মতো রাষ্ট্রে যাহারা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ জাতি তাহাদের আজ পথের ভিখারি আর উদ্বাস্তু বানানো হইয়াছে। অন্যদিকে দেড় যুগ পার হইবার পর আফগানিস্তানে কথিত সন্ত্রাস-দমন ন্যাটোর নিকট সবচাইতে বড়ো মাথাব্যথার কারণ। এই বিশ্বে কথিত শান্তি-স্বস্তি আনয়নের জন্য পরাশক্তিধররা তাহাদের স্ব-স্ব মতবাদ রপ্তানি করিতে উদ্গ্রীব। কী আশ্চর্য! নিজ নিজ ভূখণ্ডে ‘মানবতার ধারক’ এই পরাশক্তিধররা অন্য রাষ্ট্রের কিছু কিছু জাতিগোষ্ঠীর ওপর দমন-পীড়ন ও নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালাইবার ঢালাও অনুমোদন দিতে দ্বিধা করে না! আমরা অত্যন্ত দুঃখের সহিত দেখিয়াছি যে, সমগ্র বিশ্বে ‘মুসলিম ফোবিয়া’ সামাজিকভাবে এমন পর্যায়ে লইয়া যাওয়া হইতেছে, যাহা অত্যন্ত আপত্তিকর। শান্তিপ্রিয় মুসলমানদের জন্য ইহা বড়ো মানসিক পীড়নেরও কারণ বটে। ইতিহাস বলে, বিগত পনেরো শতক হইতে এখন অবধি যত বড়ো বড়ো গণহত্যা এবং বর্ণবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হইয়াছে, তাহার নেপথ্যে রহিয়াছে সম্পদ লুণ্ঠন, জাত্যভিমান ও শ্রেষ্ঠত্বের হীন মানসিকতা। শ্রেষ্ঠত্ববাদী পরাশক্তিরা মনে করে, অধিকতর শক্তিশালী জাতির বিস্তারের জন্য দুর্বলরা অবশ্যই পথ ছাড়িয়া দিবে। নচেত্ তাহাদের পথ ছাড়িয়া দিতে বাধ্য করা হইবে। এইক্ষেত্রে অন্য জাতিগোষ্ঠীকে মনে করা হয় ‘কীটপতঙ্গের’ মতো যাহাদের ধ্বংস করাটাই যেন স্বাভাবিক ব্যাপার। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’—ইহার যেন শ্রেষ্ঠত্ববাদী শক্তিশালীদের নিকট সবচাইতে বড়ো ‘মিথ্যা’।

জগতে সবাই নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করিতে চাহে। ইহাই স্বাভাবিক। সুতরাং নিজেদের রক্ষায় কেহ যদি পালটা হিংসার পথ বাছিয়া লয়—তাহা হইলে এই বিশ্ব আরো অস্থির হইয়া উঠিতে বাধ্য। সুতরাং দর্পণে নিজেদের মুখ দেখিতে হইবে শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের। তাহারা নিজেরা শান্তিতে থাকুক অন্যদেরও শান্তিতে থাকিতে দিক। নচেত্ অন্যকে ধ্বংসের আগুন তাহাদের গায়েও পড়িতে পারে।