আন্তর্জাতিক নারী পাচারকারী চক্রের ছয় সদস্য গ্রেফতার

ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে আন্তর্জাতিক নারী পাচারকারী চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। এ সময় তাদের কাছ থেকে চার তরুণীকে উদ্ধার ও ৭০টি পাসপোর্ট, ২০০টি পাসপোর্টের ফটোকপি, ৫০টি বিমান টিকেট, ৫০টি ট্যুরিস্ট ভিসার ফটোকপি এবং নগদ ১ লাখ ৫৮ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। শনিবার দিবাগত রাতে ঢাকার খিলগাঁও  থেকে পাঁচ জনকে ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে একজনকে গ্রেফতার করা হয়। গত এক বছরে একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে ৭২৯ জন তরুণীকে ড্যান্স ক্লাবের নামে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। গতকাল রবিবার দুপুরে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীস্থ র্যাব-১১-এর প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-১১-এর ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক স্কোয়াড্রন লিডার কর্নেল রেজাউল হক এসব তথ্য গণমাধ্যমকে জানান।  গ্রেফতারকৃতরা হলো:দুবাইয়ের ড্যান্স ক্লাবের মালিক মো. মনির হোসেন ওরফে সোহাগ ও আ. হান্নান, ট্রাভেল এজেন্সির মালিক মো. আকাশ, তরুণী সংগ্রহকারী এজেন্ট মো. অনিক হোসেন ও মো. আক্তার হোসেন এবং পাসপোর্ট প্রস্তুতকারী দালাল আফতাউল ইসলাম ওরফে পারভেজ।

র্যাব-১১-এর মিডিয়া অফিসার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আলেপউদ্দিন জানান, গ্রেফতারকৃতরা একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক নারী পাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী সুন্দরী তরুণীদের উচ্চ বেতনে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ড্যান্স বারে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করে থাকে। এই পাচারকারী সিন্ডিকেটের সঙ্গে বিপুল সংখ্যক এজেন্ট, পাসপোর্টের দালাল, ড্যান্স বারের মালিক, ট্রাভেল এজেন্সি ও অসাধু ব্যক্তিরা যুক্ত রয়েছে। এই নারী পাচারকারী সিন্ডিকেটের এজেন্টরা নিম্নবিত্ত পরিবারের, পোশাক শিল্পের ও ‘ব্রোকেন ফ্যামিলির’ সুন্দরী তরুণীদের প্রাথমিকভাবে টার্গেট করে থাকে। প্রথমে তরুণীদের ছবি বিদেশে অবস্থিত ড্যান্স বারের মালিকের কাছে পাঠানো হয়। ছবি দেখে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর ড্যান্স বারের মালিক অথবা তার প্রেরিত প্রতিনিধি সরাসরি উক্ত তরুণীদেরকে নির্বাচনের উদ্দেশ্যে ঢাকা অথবা আশেপাশের কোনো রেস্টুরেন্ট, হোটেল অথবা লং ড্রাইভের নামে অত্যাধুনিক বিলাসবহুল মাইক্রোবাসে সাক্ষাত্ করে থাকেন। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত তরুণীদের পাসপোর্ট উক্ত নারী পাচারকারী সিন্ডিকেট তাদের নিজস্ব পাসপোর্ট দালালের মাধ্যমে প্রস্তুত করে। ট্রাভেল এজেন্সির মালিকের মাধ্যমে নথিপত্র ম্যানেজ করে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে এই তরুণীদের মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের ড্যান্স বারে পাচার করে থাকে তারা।

গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে আরো জানা যায়, তরুণীরা বিদেশে পৌঁছামাত্র এয়ারপোর্ট থেকে উক্ত সিন্ডিকেটের সদস্যরা তাদের রিসিভ করে হোটেলে নিয়ে গৃহবন্দি করে রাখত। প্রাথমিক অবস্থায় তরুণীরা অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে রাজি না হলে বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্য জোরপূর্বক তাদের ওপর প্রয়োগ করা হয়। এভাবে দিনের পর দিন ঐ তরুণীদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চলতে থাকে। কোনো তরুণীকে কোনো খদ্দেরের পছন্দ হলে সে উক্ত ড্যান্স বারের মালিকের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে কয়েকদিনের জন্য তাকে নিয়ে যায়। আলেপউদ্দিন আরো জানান, দালালচক্র দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কিশোরী ও তরুণীদের ড্যান্স বারে পাঠায়। তবে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর থেকেই পাঠায় বেশি। উদ্ধার হওয়া চার তরুণী নারায়ণগঞ্জ এলাকার। গত এক বছরে শুধু মবিন এয়ার ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে ৭২৯ জনকে পাচার করা হয়েছে। মূলত তিন মাসের পর্যটক ভিসা নিয়ে তাদের পাঠানো হয়। ড্যান্স বারে কাজ করার কথা বলে এদেরকে যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করানো হয়।

উদ্ধার পাওয়া তরুণীরা বলে, নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে চাকচিক্যময় জীবনে গিয়ে অনেকেই দেশে ফিরে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না। প্রথমবার জোর করে যৌন পেশায় বাধ্য করা হলেও অর্থের লোভে পুনরায় তারা  সেই পথে পা বাড়ায়।

সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-১১-এর ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক জানান, এই মানবপাচার চক্রের ওপর দীর্ঘদিন যাবত্ র্যাব-১১ গোয়েন্দা নজরদারি চালিয়ে আসছিল। শনিবার দিবাগত রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানাধীন তারাবো মোড়ের শাহ চন্দ্রপুরী রেস্টুরেন্টে চার জন তরুণীকে বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে একত্রিত করেছিল পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্য। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালিয়ে ও পাঁচ জনকে গ্রেফতার করে র্যাব, উদ্ধার করে চার তরুণীকে।  গ্রেফতারকৃতদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ডিএমপি ও খিলগাঁওয়ের গোড়ান এলাকায় অভিযান চালিয়ে অপর একজনকে গ্রেফতার করা হয়।  গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।