মাদকের থাবায় তরুণ প্রজন্ম

আফসানা রিজোয়ানা সুলতানা

আমাদের তরুণ প্রজন্ম যে মাদকের ঘোরে আটকে আছে, সে ঘোর যে কবে কাটবে, তা আমাদের জানা নেই। দেশের তরুণদের একটি বড়ো অংশ মাদকে আসক্ত। তারা দেশের, সমাজের, পরিবারের কোনো কাজে তো আসেই না, বরং বোঝা হয়ে ওঠে। অবাক লাগে যখন পত্রিকায় দেখি, নেশার টাকার জন্য মাকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্তান। দশ মাস গর্ভে ধারণ করে বড়ো করে তুলে যে সন্তানকে, সেই সন্তানই হয়ে উঠে যমদূত। পরিস্থিতি কত খারাপ হলে তরুণ প্রজন্ম এমন ধ্বংসের কিংবা মৃত্যুর খেলায় মেতে উঠতে পারে, তা আমাদের ভেবে দেখা উচিত।

দেশে বর্তমানে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ মাদকে আসক্ত। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি বিরাট অংশের ছাত্রছাত্রী নেশা করে। সরকারি কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো যেন মাদকের আখড়া। এভাবে মাদকসেবীরা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করে, যা মাসের হিসাবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ খুনের সঙ্গে মাদকসেবীরা কোনো না কোনোভাবে জড়িত। পরিস্থিতির এমনি অবনতি হয়েছে যে, সরকারি চাকরিতে ঢোকার আগে মাদক পরীক্ষার কথা ভাবা হচ্ছে।

একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি তার সমস্ত মানবিক গুণাবলি হারিয়ে ফেলে। ভালো-মন্দ, ঠিক-ভুলের মধ্যে সে পার্থক্য করতে পারে না। সে খুব সহজেই অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়। যে কোনো অন্যায় কাজই তার দ্বারা করা সম্ভব। তারা তাদের নেশার টাকা জোগাড় করার জন্য বিভিন্ন অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে; যা সমাজে বড়ো আকারে বিশৃঙ্খলা ঘটায়। বর্তমানে আমাদের সমাজে মাদক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এটি আগের থেকে সহজলভ্য এবং সহজপ্রাপ্য হওয়ায় অনেকেই এই নেশার জালে জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি অভিভাবকের অসচেতনতা, হতাশা এবং বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে অনেক প্রতিভাবান তরুণ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এতে করে দেশে যে মেধার শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, তা পূরণ করা অসম্ভব।

সরকার ইতিমধ্যে দেশে মাদকবিরোধী কিছু সফল অভিযান পরিচালনা করেছে। কিন্তু শুধু এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করে দেশকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত করা সম্ভব নয়। বরং তরুণদের মাদকাসক্ত হওয়ার কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোকে সমাধানের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। আমরা যদি তরুণদের নানা ধরনের সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে পারি, আমার ধারণা—এতে করে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা এমনিতেই অনেকটা কমে আসবে। আজকাল তরুণদের মধ্যে নানা কারণে হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে। হতাশা থেকে অনেকেই মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর জন্য পাড়া-মহল্লায় বিভিন্ন সংগঠন করা যেতে পারে। এই সংগঠনের সঙ্গে এলাকার তরুণরা যুক্ত থাকবে। সংগঠনের কাজ হবে, এলাকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বুদ্ধি ও শ্রম দিয়ে এগিয়ে আসা। তারাই বরং মাদক, শিশুশ্রম, ইত্যাদি বিষয়ে এলাকাবাসীকে সচেতন করে তুলবে।

শুধু সচেতনতা কিংবা আত্মনিয়ন্ত্রণ দ্বারা একটি মাদকমুক্ত জাতি কোনো দিনই গঠন করা সম্ভব নয়, যদি না সে দেশে মাদকের জোগান বন্ধ করা হয়। একটি দেশে মাদকের জোগান থাকলে সে দেশে মাদকের কিছু গ্রাহক তৈরি হবেই। তাই এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের আরো কিছু কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে সততার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

এটি আমাদের সবার সমস্যা। শুধু একজনের সচেতনতা কিংবা চেষ্টা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব করা নয়। সমাজের সবার মিলিত প্রচেষ্টাই পারে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে। আমি স্বপ্ন দেখি এমন একটি বাংলাদেশের, যেখানে কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তি থাকবে না। একমাত্র তাহলেই দেশের প্রতিটি মানুষ একেকটি মানবসম্পদে পরিণত হবে। এর অন্যথায় হলে যে হারে মাদকের বিস্তৃতি ঘটছে তাতে করে নিকট ভবিষ্যতে আমরা একটি অন্তঃসারশূন্য জাতিতে পরিণত হব।

n লেখক:শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়