সম্প্র্রতি ঢাকার একটি হাসপাতালে এক নবজাতকের স্বাস্থ্যপরীক্ষায় দেখা যায়, শিশুটি প্রায় ১৮টি অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট। উপরন্তু, প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যেই এই সমস্যা দেখা যাইতেছে। ফলে ধারণা করা যায়, অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স বাংলাদেশের জন্য নূতন আতঙ্কের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে উপকারী অ্যান্টিবায়োটিক আর আগের মতো কাজ করিতেছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, আইসিইউতে ব্যবহূত ঔষধের মধ্যেই অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স বা ঔষধ প্রতিরোধী সবচাইতে বেশি দেখা যায়। ইহার পরই অবস্থান বার্ন, সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগের। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের চিত্র তুলিয়া ধরিয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭ হাজার ৪৮৬ অ্যান্টিবায়োটিক আইটেমের মধ্যে রিজার্ভ ড্রাগস আছে ২১২টি। এই হিসাবে রিজার্ভ ড্রাগসের পরিমাণ ৩ শতাংশ। তবে চারটি রিজার্ভ ড্রাগ সেফিপিম, লাইনেজলিড, টাইগেসাইলিন ও কোলিস্টিন বেশি মাত্রায় ব্যবহূত হয়। কিন্তু এই চারটি ঔষধ ব্যবহারকারী রোগীরাই বেশির ভাগ অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স বা ঔষধ প্রতিরোধী হইয়া উঠিতেছে। প্রতিষ্ঠানটির অপর এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের মধ্যে অন্তত ১৭টির কার্যক্ষমতা অনেকাংশে হ্রাস পাইয়াছে। এই সকল অ্যান্টিবায়োটিক মূলত মূত্রনালির সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, জখমসহ বিভিন্ন সংক্রমণের চিকিত্সায় ব্যবহার করা হইত।
অ্যান্টিবায়োটিক হইল সেই সকল ঔষধ যাহা রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা পরজীবী ধ্বংস করে। পেনিসিলিন আবিষ্কারের মাধ্যমে ১৯২৮ সালে পৃথিবীতে অ্যান্টিবায়োটিকের যাত্রা শুরু হয় এবং তখন হইতে নূতন নূতন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পাশাপাশি পাল্লা দিয়া বাড়িতেছে মানবদেহে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট। অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয়ও ব্যবহার (ঔষধের মাত্রা ও সময়কাল), কৃষি ও গবাদিপশুতে অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ইত্যাদির কারণে পৃথিবী জুড়িয়া অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট বাড়িতেছে। অদূর ভবিষ্যতে সামান্য হাঁচি-কাশি-জ্বরেও মানুষের মৃত্যুঝুঁকি হইতে পারে। বাংলাদেশে বহু মানুষ, বিশেষত নিম্ন আয়ের মানুষ চিকিত্সকের পরামর্শ না নিয়া ফার্মেসিতে গিয়া অ্যান্টিবায়োটিক কিনিয়া সেবন করেন। তাহাদের মধ্যে ধারণাই নাই যে ইহার ফলে শরীর অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট হইয়া যাইতেছে এবং পরবর্তী সময়ে কোনো সংক্রমণ হইলে তাহা আর কোনো ঔষধে হয়তো সারিবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট বিশ্ব স্বাস্থ্যের জন্য বড়ো হুমকি। মানুষ ও প্রাণিদেহে অবিবেচকের মতো অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারই ইহার প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, প্রতি বত্সর বিশ্বে ৭ লাখ মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে মারা যায়। শুধু ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রেই অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট ইনফেকশনে ৫০ হাজার মানুষ প্রতি বত্সর মৃত্যুবরণ করে।
কিন্তু বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক ঔষধ বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা নাই। কিছু নির্দেশনা থাকিলেও সেগুলি বিক্রেতা বা ক্রেতা কেহই মানে না। এখন চলিতেছে ‘বিশ্ব অ্যান্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ ২০১৯’। এই প্রেক্ষাপটেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকারি-বেসরকারিভাবে পালিত হইতেছে সপ্তাহটি। অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে ইহার ব্যবহারবিধির উপর। যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে অচিরেই অধিকাংশ অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা হারাইবে, প্রাণ বাঁচাইবার বদলে প্রাণঘাতী হইয়া উঠিবে। তাই সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আমরা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ও বিক্রয় বিষয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করিতে প্রস্তাব করিব।