নাদিরা মজুমদার
লেবাননে মহাবিক্ষোভ চলছে, কোষাগার শূন্য, ব্যাংক বন্ধ, রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ, বৈরুত বিমানবন্দর অগম্য। প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি পদত্যাগ করেছেন বটে, তবে এই পদত্যাগ লেবাননকে শান্ত করতে সহায়ক হবে না। ইরাকেও পুনরায় বিক্ষোভে ফিরে এসেছে। দুই দেশের মধ্যে মিল হলো যে, ১৯৪৩ সালের শাসনতন্ত্র অনুযায়ী লেবাননের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বণ্টন হয়; এবং সেটা রাজনৈতিক নয়, ধর্মভিত্তিক অধিভুক্তির ভিত্তিতে। ইরাকের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র লেবাননীয় পদ্ধতির হুবহু অনুসরণ/অনুকরণ করে। ২০০৫ সালের শাসনতন্ত্র অনুযায়ী একইভাবে ইরাকের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বণ্টন হয় ধর্মভিত্তিক অধিভুক্তির ভিত্তিতে, রাজনৈতিক ভিত্তিতে নয়। এবং উভয় ক্ষেত্রে সেইভাবেই রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে। এমন সিস্টেম সৃষ্টির ফলে সংশ্লিষ্ট দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হলেও সব সময় সিস্টেম সৃষ্টিকারীর ওপর নির্ভরশীল থাকে, থাকছে। লেবাননি ও ইরাকি জনগণের বিক্ষোভের একটি মূল কারণ : রাজনৈতিক দুর্নীতি। এই দুর্নীতির সমাধান তথা শাসনতন্ত্রের সংস্করণ কয়েক দিনের মধ্যে হবে না, বিশেষ করে লেবাননের ক্ষেত্রে তো বটেই। কারণ ১৯৪৩ সাল থেকে চালুকৃত যে শাসনতন্ত্র ও একটি গৃহযুদ্ধ লেবাননকে বিপর্যয়ের শীর্ষবিন্দুতে নিয়ে আসে, সেই শাসনতন্ত্রের সংস্কারকর্ম সাধনে অধিক সময় লাগবে বইকি।
লেবানন কেন অশান্ত? আসলে লেবাননই নয়, মিশর থেকে ইরাক পর্যন্ত বিস্তৃত মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন এখন অশান্ত। আরেকটি মূল কারণ : অর্থনৈতিক বিপর্যয় বা দুর্যোগ। বিক্ষুব্ধ লেবাননেরও স্থানীয় অসন্তুষ্টির মূল কারণ একই—অর্থাত্ চিরায়ত লেবাননীয় দুর্নীতি, নিত্য প্রবৃদ্ধমান সম্পদ বণ্টনে অসমতা, স্বজনপ্রীতি এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতা ইত্যাদি। এসব সত্ত্বেও অশান্ত লেবানন বিশ্বীয় মনোযোগ পায়। কেন? তার মানে কি অর্থনৈতিক দুর্যোগ ও কষ্টকর পরিস্থিতি ছাড়াও আরো গভীর কিছু রয়েছে? ঐতিহাসিকভাবে লেবানন বরাবর ‘ধারা সৃষ্টিকারী’ (ট্রেন্ড-সেটার/দি বেল ওয়েদার) দেশ হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। তাই যদি হয় তো এর অর্থ হলো—মধ্যপ্রাচ্য যে উত্তালতার কম্বলের তলায় সুপ্তাবস্থায় রয়েছে, লেবানন সুব্যক্তভাবে কাঁটায় কাঁটায় সেই উত্তালতার সতর্কসংকেত দিচ্ছে।
কারণ কী? কারণ একটাই, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ‘অ-শেষ যুদ্ধগুলোর শেষ’ ঘটানোর কথা বলে আসছিলেন, যার ব্যাপ্তি আফগানিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। উত্তর-পূর্ব সিরিয়া থেকে ধাপে ধাপে মার্কিন সেনাবাহিনীর সরিয়ে আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। ট্রাম্পের এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘নন্দিত ও নিন্দিত’ ‘ভলফোভিত্স ডকট্রিন’ (Wolfowitz doctrine) মুহূর্তের মধ্যে বাতিল হয়ে যায়। সেইসঙ্গে কিন্তু ঘটে যায় স্ট্র্যাটেজিক ‘কম্পন/ধাক্কা’। সহসা দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত পরিচিত ‘খুঁটি’টিও তাই থাকছে না।
এমন পরিস্থিতিতে সমষ্টিগত বাড়তি মনস্তাত্ত্বিক চাপ অর্থনৈতিক সংকটকে আরো ঘনীভূত হতে সাহায্য করছে বইকি! এবং নিঃসন্দেহে পশ্চিমের লিবারেল সমাজের তথা ‘খুঁটি’র কেউ কেউ বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সরে পড়া’র কারণে সৃষ্ট শূন্যস্থানে ‘প্রবেশের’ চেষ্টা করবে, করছে। তবে ‘প্রস্থান’ ও ’প্রবেশ’কে ঘিরে দুই অংশের মধ্যে কিছুটা সময়ক্ষেপণ হবে। এই বদলের অজস্র নমুনাও আমরা পাচ্ছি, নানাভাবে। যেমন: ১৫০ মিলিয়ন ডলারের মার্কিন ড্রোনকে ইরান ‘আকাশচ্যুত’ করলেও যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়াহীন থাকে, হুতিরা সৌদিদের ‘আরামকো’ স্থাপনাকে ড্রোনাঘাতে নির্মমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও ওয়াশিংটন নির্লিপ্ত থাকে, বা সৌদিদের তিন তিনটি ব্রিগেডকে হুতিরা ধ্বংস করলেও ওয়াশিংটনের তরফ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। অপরদিকে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রেসিডেন্ট পুতিনকে সুপার রেড-কার্পেট অভ্যর্থনা দেয় (অক্টোবর ২০১৯)! এগুলো থেকে পরিবর্তিত মার্কিন নীতির সংকেত পাওয়া যায়। এবং সবচেয়ে কড়া ডোজের সংকেত উচ্চারিত হয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেওর মুখ থেকে, অক্টোবর মাসের শেষের দিকে ইজরাইল ভ্রমণকালে নেতানিয়াহুকে খোলাখুলি বলেন যে—দেখ বাবা, তোমার (ইজরাইলের) নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিশ্চয়তা বিধানের পূর্ণ স্বাধীন দায়দায়িত্ব তোমার, যেমন করে এবং অন্য যে কোনো উেসর সহায়তা নিয়ে তুমি তোমার নিরাপত্তার হিল্লা করো, তবে দয়া করে টেনশন বৃদ্ধি কোরো না তথা তোমার ঝুটঝামেলার মিটমাট করতে মার্কিন সেনাবাহিনীর সাহায্যের কথা ভুলে যাও, কারণ আমরা আমাদের বাহিনী প্রত্যাহারের কর্মটি মসৃণভাবে সম্পন্ন করতে চাই। (ট্রাম্পকে অবশ্য তার এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ড রয়েসয়ে করতে হচ্ছে, কারণ কংগ্রেস বিগড়ে গেলে সমস্যা হতে পারে কিন্তু!)। ইজরাইলকে হস্তান্তরিত পম্পেওর এই মেসেজ লেবাননীয় প্রশাসনের বাড়াবাড়ি রকমের লোভাতুর এলিট দলের জন্যও প্রযোজ্য, তারা নির্দয়ভাবে স্বদেশবাসীকে দরিদ্র থেকে নিঃস্ব অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। যেমন : ২০০৫ সাল থেকে: লেবাননের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ধনীর আয়ের পরিমাণ ৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৫ শতাংশ, অপরদিকে নিঃস্ব দেশের ৫০ শতাংশের আয়ের পরিমাণ ১৫ শতাংশ হ্রাস পায় এবং দরিদ্রতম শ্রেণির ১০ শতাংশের আয়ের পরিমাণ এক-চতুর্থাংশ কমে যায়। একইভাবে ২০০৫-২০১৬ সালের সময়সীমার মধ্যে জাতীয় আয়ের ২০ শতাংশের অধিকারী থাকে লেবাননের এলিট দল, অপরদিকে চীনের ক্ষেত্রে জাতীয় আয়ের ২ শতাংশ থাকে ধনীদের হাতে, ফ্রান্সে থাকে ৫ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১০ শতাংশ। এই হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে যে সম্পদের বণ্টন বৈষম্য সর্বাধিক লেবাননে।
তদুপরি, সিরিয়ায় রুশ কূটনীতির ও নিরাপত্তাব্যবস্থার সিদ্ধিলাভ এবং পুতিন-এরদোয়ানের মধ্যে অনুষ্ঠিত সোচি সামিটের কমিউনিক—মধ্যপ্রাচ্যের উত্তরাঞ্চলের ‘অভ্যস্ত পরিচিত অবস্থাকে’ একেবারে এলোমেলো করে দিয়েছে। এর ফলে সিরিয়ার ক্ষেত্রে তো বটেই, লেবানন এবং ইরাকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন বিন্যস্তকরণ কাঙ্ক্ষিত ও অনিবার্য হয়ে পড়েছে। নতুন বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব যখন আঞ্চলিক রাজনৈতিক মঞ্চে ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর নক্ষত্রে পরিণত হচ্ছে, তার অনুরণন হিসেবে লেবাননের ঘটনাবলির অবতারণা হয়। এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতেও সেটি লক্ষণীয়। সৌদিরা কি অবশেষে লেবাননকে “তা’য়েফ কনস্টিটিউশনাল সেটলমেন্ট” বাস্তবায়ন করতে দেবে? দেখা যাক!
আরব বিশ্বের এলিটরা তো বটেই, বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য দেশে চলমান প্রতিবাদ থেকে বলা চলে যে বিদ্যমান এলিটরা বৈধতার ঘাটতিজনিত সমস্যায় জর্জরিত। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন ইত্যাদি দেশে চলমান প্রতিবাদ যথাযথভাবে নির্দিষ্ট এলিটদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে। জাতিসংঘের মতে, লেবাননের এক-তৃতীয়াংশ জনসমষ্টি দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবন যাপন করছে, ভাবা যায়? দেশের জাতীয় সম্পদের এক-চতুর্থাংশ রয়েছে জনসমষ্টির ১ শতাংশ অধিবাসীর হাতে। আরো বড়ো সত্য হলো যে এই অঞ্চলের মোট জনসমষ্টির অর্ধেক পরিমাণের বয়স ২৫ বছরের নিচে। তাই প্রশ্ন হলো, এদের ভবিষ্যত্ কী? বর্তমানে আমরা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের এক নতুন যুগে বা চক্রে প্রবেশ করছি। বিশ্বের বিশাল মাপের নামিদামি হোমড়াচোমড়া কেউকেটা ব্যাংকওয়ালাদের জন্য ব্যালান্সশিট তৈরির কাল এখন ক্ষয়মুখী, অস্ত যাওয়ার পথে, মাত্র শুরু হয়েছে ‘নতুন বাণিজ্য যুদ্ধের’, বিষয়বস্তু হচ্ছে নিয়ন্ত্রণক্ষমতা অর্জনকরণ। যার অর্থ, পরবর্তী কয়েক দশকের জন্য শিল্প (ইন্ডাস্ট্রি) স্ট্যান্ডার্ডস আরোপ যে করবে, বিশ্ব কর্তৃত্ব তার হবে। অন্যভাবে, এই টেক স্ট্যান্ডার্ডসই নতুন যুগের নতুন ‘মুদ্রা’ ওরফে নতুন ‘ডলার’রের ভূমিকা নেবে।
অর্থাত্ নতুন যুগের যুদ্ধ হলো টেক-যুদ্ধ। ‘ফাইভ-জি’কে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ইত্যবসরেই চীনের সঙ্গে এই টেক-যুদ্ধের সূচনা করেছে বলা যায়। যুদ্ধ হবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এবং অপেক্ষাকৃত কম মাত্রায় হবে রাশিয়ার সঙ্গে। দুরূহ কঠিন হবে বটে, তবে ইউরোপও যত্সামান্য প্রতিযোগিতায় নামবে। টেক নবমার্গকেন্দ্রিক এই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সম্পর্ক কী, খুঁজতে হলে উদাহরণ দেওয়া যাক। তবে মনে রাখতে হবে যে অর্থনীতির জগতে উত্কৃষ্ট টেককে ‘টেক্কা’ দেওয়ার দক্ষতা সবার থাকবে না এবং মানবশ্রমের চাহিদাও কম হবে। ফলে যেমন যুক্তরাষ্ট্রে কমসে কম ২০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক চাকরির বাজারে ‘প্রয়োজন নেই’য়ের দলভুক্ত হবে (নির্মম হলেও সত্য যে কম বেতনের চাকরিগুলো স্মার্ট-রবোটরা দখল করে নেবে)। ইউরোপে ‘প্রয়োজন নেই’য়ের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি হবে আর যে ক্ষেত্রে মোট জনসমষ্টির আধাআধি পরিমাণের বয়স ২৫-এর কম, সেই মধ্যপ্রাচ্যে কতজন ‘প্রয়োজন নেই’ হবে? হিসাব করা হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর এবং যদিও লেবাননের কোনো জ্বালানিসম্পদ নেই, কিন্তু জনসমষ্টির বিরাট অংশ উপসাগরীয় দেশগুলোতে জ্বালানিসম্পদ-সংশ্লিষ্ট নানা ধরনের কর্মে নিয়োজিত। আয়ের একটা অংশ তারা ব্যাংকের মাধ্যমে লেবাননে পাঠিয়ে থাকে। সেই ক্ষেত্রে লেবাননীয় অর্থনীতিও উল্লেখযোগ্য ব্যাপ্তিতে জীবাশ্ম-জ্বালানিভিত্তিক। তাছাড়া অনেক লেবাননীয় ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে চাকরি করে। তাই জীবাশ্ম-জ্বালানি যখন কর্মস্থানের মূল উেসর ভূমিকা হারাবে, মধ্যপ্রাচ্যের কর্মক্ষম বিশাল জনসমষ্টি তখন কী করবে?
n লেখক : বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক