কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা গেছেন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রবিউল হুসাইনের মৃত্যু হয়। ৭৬ বছর বয়স্ক রবিউল হুসাইন রক্তের ইনফেকশন জটিলতায় ভুগছিলেন। গত দুই সপ্তাহ ধরে তাকে হাসপাতালে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু অবস্থার অবনতি হওয়ায় গত সোমবার তাকে সিসিইউতে নেওয়া হয়।
রবিউল হুসাইনের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, কবি কামাল চৌধুরী প্রমুখ।
আজ বুধবার সকাল ১০টায় কবির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে বাংলা একাডেমিতে। সকাল সাড়ে ১০টায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হবে সর্বস্তরের নাগরিকদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। পরে তার মরদেহ নেওয়া হবে দীর্ঘদিনের কর্মস্থল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে রবিউল হুসাইনকে মিরপুরের শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী। এর আগে গতকাল সকালে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল থেকে রবিউল হুসাইনের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার ধানমন্ডির বাসায়। রাতে আবার কফিন রাখা হয় বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালের হিমঘরে।
ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৮ সালে একুশে পদক পাওয়া রবিউল হুসাইন কাজ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের জন্যও। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণকেন্দ্রের ট্রাস্টি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী পরিষদের সদস্য। ষাটের দশকে ছাত্র থাকাকালেই তার বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস মিলিয়ে দুই ডজনের বেশি বই রয়েছে তার।
স্থপতি রবিউলের ঝোঁক ছিল ইট নিয়ে নকশা ও ডিজাইনের প্রতি। তার প্রিয় কাজের মধ্যে ছিল বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচার রিসার্চ কাউন্সিল (বিএআরসি) ভবনটি। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তি ও স্বাধীনতা তোরণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট, ভাসানী হল, বঙ্গবন্ধু হল, শেখ হাসিনা হল, খালেদা জিয়া হল, ওয়াজেদ মিয়া সায়েন্স কমপ্লেক্স, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটরিয়াম ও একাডেমিক ভবন কমপ্লেক্স নির্মিত হয়েছে রবিউল হুসাইনের নকশায়।
বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য রবিউল শিশু-কিশোর সংগঠন কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর, ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ক্রিটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন।
ঝিনাইদহের শৈলকূপার সন্তান রবিউল হুসাইনের জন্ম ১৯৪৩ সালে। কৃষ্টিয়ায় মেট্রিক আর ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে তিনি ভর্তি হন বর্তমান বুয়েটের আর্কিটেকচার ফ্যাকাল্টিতে। একুশে পদক ছাড়াও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, কবিতালাপ সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ও সার্চ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এই কবি।
প্রধানমন্ত্রীর সমবেদনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রখ্যাত কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইনের বাসভবনে গিয়ে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। প্রধানমন্ত্রী গতকাল বিকালে রবিউল হুসাইনের বাসায় যান। তিনি সেখানে কিছু সময় অবস্থান করেন। তিনি কবির পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান ও সান্ত্বনা দেন এবং তার রুহের মাগফিরাত কামনা করেন। এর আগে এক শোকবার্তায় শেখ হাসিনা রবিউল হুসাইনের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তার মৃত্যুতে দেশ ও জাতি একজন দেশপ্রেমিক ও বহুগুণে গুণান্বিত এক ব্যক্তিকে হারাল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রবিউল হুসাইন একাধারে স্থপতি, কবি, শিল্প-সমালোচক, ছোটো গল্প লেখক, প্রবন্ধকার ও সাংস্কৃতিক কর্মী ছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘রবিউল হুসাইন তার কাজের মধ্য দিয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন’।
জেপির শোক
রবিউল হুসাইনের ইন্তেকালে জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
এক বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় বলেন, তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি, বিশিষ্ট কবি ও প্রগতিশীল চিন্তার ধারক। তার মৃত্যুতে দেশ এক গৌরবদীপ্ত সন্তানকে হারাল।
নেতৃদ্বয় মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।