পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজি : ব্যবসা যা করার করে নিয়েছে সিন্ডিকেট

পরিকল্পিতভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সিন্ডিকেট। আর এই সিন্ডিকেট ভাঙতে আগে কোনো ধরনের উদ্যোগ না নিয়ে এখন তৎপর হয়েছে সবাই। তারপরও পেঁয়াজের মূল্য এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। লবণের মূল্য কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নিয়ন্ত্রণে এলেও পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে প্রতিদিনই বাড়ানো হচ্ছে এর দাম। এখন ২৫০ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে।

 

 

দুই মাস ধরে চলছে পেঁয়াজ কেলেঙ্কারি। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে প্রতি কেজি পেঁয়াজের আমদানি মূল্য ছিল ৩০ থেকে ৩৩ টাকা। ভারত পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য বাড়ানোর কারণে এর দাম আরো বেড়ে ৭০ টাকায় ওঠে। তবে অন্য দেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি কেজির খরচ পড়েছে ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা। ঐ সব পেঁয়াজ এ দুই মাসে বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা দরে। এভাবে বাড়তি মুনাফা করে সিন্ডিকেটের সদস্যরা গত দুই মাসে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ভোক্তাদের পকেট থেকে। সিন্ডিকেটের চার জন বড়ো মাপের ব্যবসায়ী প্রত্যেকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন পেঁয়াজ আনার ঘোষণা দেন। বিভিন্ন মহল থেকে একই বাণী শোনানো হয় ভোক্তাদের। এমনকি তারা ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রি করবেন এমন ঘোষণাও দেন। কিন্তু ঘোষণা পর্যন্তই শেষ। রহস্যজনক কারণে তাদের পেঁয়াজ আর আসেনি। এখন তারা পেঁয়াজ আনার জন্য তত্পর। ঐ সময় পেঁয়াজের দাম প্রতিদিন বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে তারা সফল হয়েছেন। সব মহলের চোখের সামনে পেঁয়াজের এত বড়ো কেলেঙ্কারি করে তারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। অথচ এখন বিভিন্ন সংস্থা তত্পরতা দেখাচ্ছে। কত ধরনের আশার বাণী শোনাচ্ছে। এগুলো শুধু বলার জন্য বলা। নেপথ্যে সিন্ডিকেটের সঙ্গেই তারা রয়েছে।

 

সিন্ডিকেট পেঁয়াজ গুদামে রেখে পচিয়ে নদীসহ বিভিন্ন স্থানে ফেলে দিয়েছে। সিন্ডিকেটের সঙ্গে আমদানিকারক, খুচরা ব্যবসায়ী ও কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে দাবি তোলা হলেও এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অতীতেও এসব সিন্ডিকেটের সদস্যরা থেকেছেন অধরা। এ অবস্থায় সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পেঁয়াজের দাম বাড়ানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরো পড়ুন : পেঁয়াজের দর বৃদ্ধি : বড়ো পাইকারদেরও ডাকবে শুল্ক গোয়েন্দা

শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির হোতা চার ব্যবসায়ী। তারা ৪২ হাজার কোটি টাকা শেয়ারবাজার থেকে হাতিয়ে নিয়ে গেলেন। তাদের বিরুদ্ধে কত ধরনের তদন্ত হয়েছে, কিন্তু কিছুই করতে পারেনি। পেঁয়াজ কেলেঙ্কারি ও শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পেছনে রয়েছেন একই ধরনের লোকেরা। সিন্ডিকেটের কারণে অনেক মাঝারি ও ছোটোখাটো ব্যবসায়ী ব্যবসা বন্ধ করে বিদেশে চলে যাচ্ছেন।

 

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার দেশের বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজের দাম আরো এক দফা বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে, যা সোমবার ছিল ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা। তবে রাজধানীর বাইরে কোথাও কোথাও খুচরা বাজারে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা দরেও বিক্রি হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী আশঙ্কা করেছেন, এর দাম আরো বাড়বে। বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হলেও বাজারে কোনো প্রভাব পড়ছে না। নতুন পেঁয়াজ বাজারে না আসা পর্যন্ত দাম বাড়তেই থাকবে। কেননা, পাইকারি বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পেঁয়াজ মিলছে না। এ কারণে খুচরা বাজারে দাম বেড়েই চলেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত জুলাই-আগস্টের শুরুতে প্রতি কেজির দাম ছিল ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। এর পর থেকেই দাম বাড়তে থাকে। গত ১২ সেপ্টেম্বর দেশের বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৫০-৫৫ টাকা কেজি। ভারত ১৩ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য বাড়িয়ে ৮৫০ ডলার করার পর এর দাম হু-হু করে বেড়ে যায়। এই খবরে সেদিন দেশের খুচরা বাজারে ২৫-৩০ টাকা বাড়িয়ে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৮০ টাকায়। এই দরে পেঁয়াজ বিক্রি হয় ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করলে এর দাম আরো লাফিয়ে বাড়তে থাকে। দাম বেড়ে ওঠে ১২০ টাকা কেজি। দুই দেশের আমদানি ও রপ্তানিকারকেরা এই পেঁয়াজ কেলেঙ্কারির নেপথ্যে বলে অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন। তারা জেনেশুনে এমন এক সময়ে কেলেঙ্কারি করেছেন, যখন পেঁয়াজের দাম আকাশচুম্বী।

 

পেঁয়াজের দাম কেন নিয়ন্ত্রণে এলো না—এ প্রশ্ন এখন সবার। পেঁয়াজের সিন্ডিকেটকে কি সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে? পেঁয়াজ মজুত রেখে দাম বাড়ানো হচ্ছে হু-হু করে। মজুত রাখা পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে, কিন্তু বাজারে ছাড়া হচ্ছে না। তাহলে বাজার মনিটরিং টিমও কি এই সিন্ডিকেটের অংশ? এমন প্রশ্নও ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

 

ইত্তেফাক/ইউবি