আদর্শিক সংকটে দ্বান্দ্বিক রূপ নেয় অনুদ্ধারণীয়

মা হ বু ব  আ ল ম

 

পাঠককে সম্মোহন করার এক অমোঘ শক্তি আছে কবির। কবি পারেন তার ভক্তদের বা পাঠকদের সম্মোহিত করে রাখতে। কবিতার যে শক্তি তা ভেঙেচুরে ফেলতে পারে সমস্ত কিছু, আবার পাঠকের আবেগ অনুভূতিকে একত্রিত করে গড়তে পারে কল্যাণকর কিছু। কবিতার যে ভাব তা কখনো বুঝা যায় তাত্ক্ষণিক, আবার অনেককাল পেরিয়ে গিয়ে পাঠকের ম্যাচুরিটির সঙ্গে তা বেড়ে ওঠে এবং বোধগম্য হয়।

কবি তার কবিতায় কী রচনা করে যাচ্ছেন? তার সেই রচনা কবি ভক্তের মনে কী রূপ প্রভাব ফেলছে? তার দায় কবির উপরে বর্তায় কি না? এমন নানাবিধ বিষয়ে কবিকে তার এক ভক্ত অমিতের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় ‘অনুদ্ধারণীয়’ নাটকে।

যুবক বয়সের এক ধরনের পাগলামি আছে, যা শুভ-অশুভ দুটো দিকই বয়ে আনতে পারে। যুবক বয়সের পাঠক অমিত মোহিত হয় কবির কবিতায়। সে কবিকে তার আইকন মনে করে। অমিত শুধু নিজের আইকন নয়, কবিকে মনে করেন সমগ্র সমাজের আইকন। কিন্তু সেই আইকন যখন বদলে যায়, পাল্টে যায় সমাজে কীট রূপে; তখন অমিতের মতো যুবকের মনে দেখা দেয় নানা প্রশ্ন। তখন ভালোবাসা বিষে রূপ নেয়, শ্রদ্ধা পর্যবসিত হয় ঘৃণায়। তৈরি হয় নানা সংকট। আদর্শিক সংকটে দ্বান্দিক রূপ নেয় নাটক অনুদ্ধারণীয়।

ঢাকার মঞ্চের সদ্যজাত নাটকের দল অনুস্বর অনুদ্ধারণীয় নাটক তেমনি এক সংকটকে তুলে এনেছে মঞ্চে। বুদ্ধদেব বসুর গল্প ‘অনুদ্ধারণীয়’ অবলম্বনে মঞ্চরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন দলটির অন্যতম অভিনেতা ও নির্দেশক মোহাম্মদ বারী। গল্পকে সমকালীন রূপ প্রদানে কিছুটা এদিক সেদিক করেছেন, এটা বোঝায় যায় যখন সমসাময়িক বৈশ্বিক ঘটনাবলি নাটকে উপস্থাপিত হয়। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সমস্যা তো এখন বাংলাদেশের জন্য একেবারে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যা হোক, অমিত একজন তরুণ যুবক। সে কবির কবিতা পড়ে উদ্বুদ্ধ হয় দেশপ্রেমে। কবির প্রেম ও ভালোবাসায় উদ্দীপ্ত হয় সে। কিন্তু যখন সেই টগবগে যুবক কবির লেখা কবিতায় প্রতারণার ছাপ দেখতে পায়, তখন তার প্রেম-ভালোবাসা পর্যবসিত হয় ঘৃণায়। প্রতারক কবিকে সে তুলে নিয়ে আসে এক নির্জন জায়গায়। আবেগ ও বিবেক তাড়িত নানা প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করতে থাকে সে কবিকে। কবি অবশ্য অমিতের সব প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারে না। অবশেষে অমিত কবিকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে কবিকে খোঁজার জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলার র্যাব বাহিনী চলে আসে তাকে উদ্ধার করতে। ঘিরে ফেলে অমিতকে। গুলি করে। মঞ্চের আলো সঙ্গে সঙ্গে নিভে যায়। নাটকের সমাপ্তিতে বোঝা দুষ্কর হয়ে যায় যে অমিত কি নিজে নিজেকে গুলি করে মারে নাকি সে কবিকে গুলি করে! এই দোলাচল দর্শকের ভাবনার জন্য ছেড়ে দিয়েছেন নির্দেশক মোহাম্মদ বারী। তবে নাটকের গল্প বুননের যে গতি তাতে মনে হয় অমিত কবিকে গুলি করে। কেননা, অমিতের চোখে কবি একজন পথভ্রষ্ট নষ্ট মানুষ। সমাজের এমন কীটকে সে বাঁচিয়ে রাখতে চায় না। যদি অমিতের দৃষ্টিকোণ থেকে নাটককে পর্যালোচনা করা হয় তবে অমিতের এমন সিদ্ধান্তও আইন বিরুদ্ধ কাজকে উসকে দেয়। আবার যদি ধরে নিই যে, অমিত নিজেকে গুলি করে, অর্থাত্ নিজে আত্মহত্যা করে, তবে সেটি হবে সততার পথ থেকে যুব সমাজের পলায়নপরতা। আসলে কে, কেন, কাকে গুলি করে; সেটি অন্ধকারেই থেকে যায়। দর্শক ভাবনার পাঠ হয়ে যায় ‘অনুদ্ধারণীয়’। দর্শক নিজের মতো করে উত্তর বের করে নিতে পারে। তবে যাহোক, কোনো মৃত্যুই কাঙ্ক্ষিত নয়।

এবার নাট্য নির্মাণের কুশলতার দিক নিয়ে আলোচনা করা যাক। শিল্পী শাহিনুর রহমানের নাটকে সাজেস্টিভ সেট ব্যবহার খুব সাবলীল মনে হয়েছে। অভিনেতার পোশাক বর্তমান সময়কে বেশ ভালোভাবেই উপস্থাপন করে। আলোর ব্যবহার ও ভিজ্যুয়াল প্রজেকশনের মাধ্যমে বিশ্বের স্বনামধন্য চিত্রকরদের চিত্রকর্ম নাটকের গল্পের সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর নাটকে কবি চরিত্রে মোহাম্মদ বারীর অভূতপূর্ব অভিনয়ে বেশ চমত্কার সঙ্গত দেন আরেক অভিনেতা মাজিদুল মিঠু। বুদ্ধদের বসুর ১১০তম জন্মবার্ষিকী স্মরণে ২৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় বাংলাদেশ মহিলা সমিতি মঞ্চে ‘অনুদ্ধারণীয়’ নাটকের আরো একটি প্রদর্শনী সম্পন্ন করবে। এবারও নিশ্চয় দর্শক মুগ্ধ হবে অনুস্বর নাট্যদলের অভিনেতাদের অভিনয়ে।

নাটকে মোহাম্মদ বারী ও মাজিদুল মিঠু ছাড়াও অভিনয় করেছেন মাহফুজ সুমন, সরকার জামান, এস আর সম্পদ, অরভিল রুবেল, শাকিল মাহমুদ, মোহাম্মদ রাকিব, ফরিদা লিমা ও শাহনাজ জাহান।